আবেগ আর অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় লিখলেন মেসি
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪২ পিএম
আর্জেন্টাইন ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসি
২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় লিখলেন আর্জেন্টাইন ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসি। বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবার মাঠে নামেন ৩৯ বছর বয়সী এই ফুটবল জাদুকর। ম্যাচ শেষে আবেগ আর অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় তাকে বিদায় জানান প্রায় ৮৫ হাজার দর্শক।
বিদায়ী ম্যাচে মেসি শুধু দর্শকদের আবেগে ভাসাননি, নিজের নামও লিখেছেন স্কোরশিটে। ২০৮তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে নেমে আর্জেন্টিনার হয়ে ১২৬তম গোলটি করেন তিনি। ম্যাচে একটি গোলের সুযোগ তৈরি করে দেন অভিজ্ঞ নিকোলাস ওটামেন্দির জন্য। আর্জেন্টিনার হয়ে অন্য গোলটি করেন নিকো পাজ।
তবে ৩-০ ব্যবধানের জয় ছাপিয়ে ম্যাচটির মূল আকর্ষণ ছিল মেসির বিদায়। ‘দ্য লাস্ট ট্যাঙ্গো’ নামে আয়োজিত এই ম্যাচে শেষবারের মতো মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের দর্শকদের সামনে জাতীয় দলের জার্সিতে দেখা যায় আর্জেন্টিনার সর্বকালের অন্যতম সেরা এই তারকাকে।
ম্যাচ শেষে সমর্থকদের উদ্দেশে আবেগঘন বক্তব্যে মেসি বলেন, দুই দশকেরও বেশি সময় আর্জেন্টিনার জার্সি পরতে পারা তার জন্য গর্বের। জাতীয় দলের হয়ে খেলা একজন ফুটবলারের জীবনে পাওয়া সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতাগুলোর একটি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে অবশ্য কোনো অনুশোচনা নেই মেসির। সর্বশেষ বিশ্বকাপের কঠিন সময় এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, সারাজীবন খেলতে চাইলেও এখন সরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে বলে মনে করছেন।
বিদায়ের আগে মেসিকে অশ্রুসিক্ত চোখে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করতে দেখা যায়। তিন সন্তানকে সাথে নিয়ে মাঠে নামেন তিনি। ভিআইপি বক্স থেকে স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও মা সেলিয়া কুচ্চিত্তিনি তাকে শুভেচ্ছা জানান। ম্যাচ শুরুর আগে মাঠে বিশাল আর্জেন্টিনা জার্সি মেলে ধরা হয়, যেখানে মেসির ১০ নম্বরের ওপরে লেখা ছিল ‘Gracias’।
জাতীয় সংগীতের সময়ও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মেসি। ফকল্যান্ডস যুদ্ধের সাবেক সেনা ফ্যাবিও সান্তানা সংগীত পরিবেশন করার সময় তার পাশে ‘মালভিনাস আর্জেন্টিনার’ লেখা ব্যানার প্রদর্শিত হয়।
ম্যাচের ১০ মিনিটে মেসির ১০ নম্বর জার্সির প্রতি সম্মান জানিয়ে খেলা থামিয়ে দেয়া হয়। পুরো স্টেডিয়াম করতালিতে তাকে সম্মান জানায়। এরপর ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে বিদায়ী ম্যাচকে আরো স্মরণীয় করে তোলেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকা।
শেষ বাঁশির পর মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের আকাশে শুরু হয় বিশেষ ড্রোন শো। আকাশে ফুটে ওঠে মেসির ছবি এবং তার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রতি কৃতজ্ঞতার বার্তা।
বিদায়ের আগে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) সদর দপ্তরে বুয়েনস আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয় মেসিকে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করে। সম্মান পেয়ে গর্ব প্রকাশ করে মেসি রসিকতার সুরে বলেন, এখন তিনি নিজেকে ‘সম্মানসূচক ডাক্তার’ বলতে পারবেন।
মেসির বিদায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমারও। সাবেক বার্সেলোনা সতীর্থ মেসিকে ফুটবলের জন্য তার অবদানের কারণে ধন্যবাদ জানান তিনি। নেইমারের ভাষায়, মেসি শুধু আর্জেন্টিনা নয়, পুরো বিশ্বকেই ফুটবলের প্রতি আরো ভালোবাসতে শিখিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর সময় মেসির নামের পাশে রয়েছে অসংখ্য অর্জন। ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়ে ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপ জেতান তিনি। তার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকাও জিতেছে। বিশ্বকাপে ২০১৪ সালে রানার্সআপ হওয়ার পর ২০২৬ সালেও ফাইনালে ওঠে দলটি।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ২১ বছরের পথচলা তাই শেষ হলো একদিকে চোখের জলে, অন্যদিকে অসংখ্য শিরোপা, রেকর্ড ও স্মরণীয় মুহূর্তের গৌরব নিয়ে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার বিদায় আর্জেন্টিনা তো বটেই, বিশ্ব ফুটবলের জন্যও শেষ হলো এক ঐতিহাসিক অধ্যায়।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)