দলীয় শৃঙ্খলায় কঠোর বিএনপি, বিলুপ্ত একাধিক কমিটি
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৩ এএম
বিএনপি।
দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও ভাবমূর্তি রক্ষায় অনিয়ম এবং অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। দলের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখলদারি, ভাঙচুর কিংবা প্রভাব বিস্তারের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িতদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না বলে জানিয়েছে দলটির হাইকমান্ড। এ অবস্থানের অংশ হিসেবে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক কমিটি বিলুপ্ত এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বহিষ্কার করা হয়েছে।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার করে দখল, চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগে কয়েকজন নেতা-কর্মীর কর্মকাণ্ড নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অসন্তুষ্ট। তাদের মতে, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়ানোর প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর পড়ে না; দল ও সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রত্যাশা পূরণে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখাকে গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি।
দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও দখলদারিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে বহিষ্কার ও পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও জানিয়েছেন, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং তা আরো জোরদার করা হবে। অপরাধ দমনে কারও রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর, লুটপাট ও দখলের ঘটনায় সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযোগের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। তবে কমিটি বিলুপ্তির আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে ওই ঘটনার কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই দিনে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও ভেঙে দেওয়া হয়। অনৈতিক, সাংগঠনিক শৃঙ্খলাবিরোধী ও দলবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর পল্লবীর ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মোফিজুর রহমান মামুনকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতার মতে, সাম্প্রতিক সাংগঠনিক সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের যোগসূত্র থাকতে পারে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অবস্থান হলো, দলীয় পদ বা পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ালে সাংগঠনিক পরিচয় কাউকে সুরক্ষা দেবে না। এ কারণে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থার পাশাপাশি সাংগঠনিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় এ ধরনের পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরাও। জাতীয় অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, অনিয়ম ও অপকর্মের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বিএনপি নেতৃত্ব সাম্প্রতিক অভিযোগগুলোর পর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা দেশ ও জাতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। ভবিষ্যতেও এ বিষয়ে সতর্ক থাকার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, সংসদ সদস্যের পদত্যাগ, কমিটি বিলুপ্তি ও বহিষ্কারের মতো সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায়, দলীয় নেতৃত্ব অনিয়মের অভিযোগকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাঁর মতে, অনিয়মে জড়িতদের সমর্থন না দিয়ে আইনশৃঙ্খলা ও জনস্বার্থে কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
এদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এসব ঘটনাকে সরকারের জন্য ‘অশনিসংকেত’ হিসেবে উল্লেখ করে জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সারা দেশে দলের অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপির জন্য বিষয়টি এখন দলীয় শৃঙ্খলার পাশাপাশি সরকার ও প্রশাসনের ভাবমূর্তির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং মাঠপর্যায়ে দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দলীয় পরিচয়ের অপব্যবহার ঠেকানো, অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)