বিরোধী দলগুলোর আত্মস্বীকৃত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে রিজভীর প্রশ্ন
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০০ পিএম
ছবিঃ আমার দেশ
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেছেন, বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকা কয়েকটি রাজনৈতিক দল সাম্প্রতিক সময়ে আত্মস্বীকৃত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। বাস ও ট্রেনে আগুন দেওয়া, ককটেল বিস্ফোরণসহ বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে এসব কর্মকাণ্ডের সাথে কারা জড়িত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
মঙ্গলবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন রিজভী। জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট আয়োজিত এ সভায় তিনি দাবি করেন, ‘পতিত স্বৈরাচারদের’ পাশাপাশি আত্মস্বীকৃত সন্ত্রাসীদের বক্তব্যও প্রকাশ্যে আসছে এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের ভেতর থেকেও হুমকি দেয়া হচ্ছে।
রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে সাম্প্রতিক হামলার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, গত রবিবার রাতে গুপ্ত বলে পরিচিত একটি সংগঠনের ছাত্র সংগঠন সেখানে ভাঙচুর ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। এ ধরনের ঘটনার দায় কে নেবে—সেই প্রশ্ন তুলে রিজভী বলেন, পরিকল্পিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সামর্থ্য থাকলে সংশ্লিষ্টদের লংমার্চ করার আহ্বান জানানো উচিত।
জামায়াতের সমালোচনা করে রিজভী অভিযোগ করেন, দলটি একদিকে বিরোধী বক্তব্য দিতে মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের ‘সোনালি বা রুপালি রঙের ছেলেদের’ উসকে দিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। তার দাবি, দেশের রাজনৈতিক বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে জামায়াত বিরোধিতা করেছে এবং জনগণের পক্ষে তাদের কার্যকর ভূমিকা ছিল না।
তিনি বলেন, পাকিস্তান আন্দোলন, ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনে জামায়াতের অবস্থান ছিল বিরোধিতামূলক। ইসলামের নাম ব্যবহার করে জনগণের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ কারণে দলটি জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন রিজভী।
দেশের অর্থনীতি নিয়েও বক্তব্য দেন বিএনপির এই নেতা। তার দাবি, সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে অপপ্রচারের মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংক থেকে অর্থ পাচার বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান লুটপাটের মতো পরিস্থিতির কথা কেউ বলতে পারবে না। তার দাবি, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত আবারও স্থিতিশীলতার পথে ফিরছে, রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আড়াই গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের লংমার্চ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রিজভী। তিনি বলেন, দুর্নীতির প্রতিবাদ ও জনস্বার্থের দাবিতে চট্টগ্রাম ও রংপুরে লংমার্চ আয়োজন ইতিবাচক। তবে রংপুরে নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামো থাকার পরও প্রায় ৪৫০টি গাড়ি নিয়ে সেখানে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
জ্বালানি সংকটের সময় বিপুলসংখ্যক গাড়ি ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। রিজভীর ভাষ্য, ৪৫০টি গাড়িতে যে জ্বালানি ব্যয় হয়েছে, তা সাশ্রয় করা সম্ভব হলে অন্য কাজে ব্যবহার করা যেত। বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
লংমার্চে অংশ নেওয়া গাড়ির সংখ্যা নিয়ে রিজভী বলেন, তিনি কোনো তথ্য বানিয়ে বলছেন না। যমুনা সেতুর টোলের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৪৫০টি গাড়ি সেতু পার হয়েছে বলে তার দাবি। অন্যদিকে লংমার্চে অংশ নেয়া ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে ১ হাজার গাড়ি নেয়ার কথা বলা হয়েছে। এ কারণে কিছু গাড়ির টোল পরিশোধ না করার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সমসাময়িক প্রতিবেদনে যমুনা সেতু টোল প্লাজা সূত্রের বরাত দিয়ে প্রায় ৪৩০ থেকে ৪৫০টি গাড়ি সেতু পার হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
বৈশ্বিক সংকটের প্রভাবকে কেন্দ্র করে সরকার ও প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগও করেন রিজভী। তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের সাথে সরকার, বিরোধী দল কিংবা দেশের সাধারণ মানুষের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সংকট বাংলাদেশের সীমানার বাইরে হলেও সেটির দায় সরকারের ওপর চাপানো হচ্ছে এবং প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রিজভী বলেন, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ রয়েছে বলেই বিরোধী দল সংসদ ও সংসদের বাইরে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারছে এবং সরকারের সমালোচনা করতে পারছে। বিরোধী দলগুলো লংমার্চ করলেও সরকার বা সরকারের পক্ষের কোনো দল তাতে বাধা দেয়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনার সময়ের ব্যক্তিগত আক্রমণ ও কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যেই গণতান্ত্রিক আন্দোলন হয়েছিল। কিন্তু সেই একই ধরনের রাজনৈতিক চর্চার পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে আবু সাঈদসহ আন্দোলনে নিহতদের আত্মত্যাগের কথাও স্মরণ করেন রিজভী।
সভায় শেখ হাসিনার শাসনামলের সাথে অতীতের রাজনৈতিক নিপীড়নের তুলনাও করেন বিএনপির এই নেতা। তার ভাষ্য, অতীতে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী দেশের মানুষের ওপর বর্বর আচরণ ও নিপীড়ন চালিয়েছে। শেখ হাসিনার সময়ের নিপীড়নও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার কাছে আরো বেশি ভয়াবহ মনে হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগের সভাপতি ব্যারিস্টার নাসিম খানের সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (রাজনৈতিক) রাশেদ খান, গণদলের চেয়ারম্যান এ টি এম গোলাম মওলা, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ-আল-হারুন (সোহেল), ডেমোক্রেটিক লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন চন্দ্র দাস, সাম্যবাদী দলের সভাপতি সাইদ আহমেদ, বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল বারেক, এনডিপির মহাসচিব জামিল আহমেদ, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টির মহাসচিব সাইফুল ইসলাম, বিএমএলের মহাসচিব রেজওয়ান মর্তুজা ও গণদলের মহাসচিব আবু সৈয়দ।
জোটের মুখপাত্র ও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান এস এম শাহাদাত সভাটি সঞ্চালনা করেন।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)