আসিফ মাহমুদের ১৩ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির তদন্তে নামছে দুদক
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া
সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, ঘুষ, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, প্রকল্প ও টেন্ডারে কমিশন এবং বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুদক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
দুদকে জমা পড়া অভিযোগে উল্লেখিত বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের অঙ্ক যোগ করলে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা হয় বলে জানা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে মোট ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার। বাকি অভিযোগগুলো নিয়োগ-পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি, টেন্ডার, উন্নয়ন প্রকল্প ও ঘুষ লেনদেনকে কেন্দ্র করে।
দুদক সূত্র জানায়, আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে নতুন অভিযোগগুলো যুক্ত করে বিস্তৃতভাবে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ২ সেপ্টেম্বর আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, কেনাকাটা ও টেন্ডারসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল। নতুন অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। এ ছাড়া দেশের ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে প্রত্যেকের ক্ষেত্রে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। সে হিসাবে অভিযোগে সম্ভাব্য লেনদেনের পরিমাণ ৭২ কোটি থেকে ৩৬০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। বিষয়টি যাচাই করবে দুদক।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন টেন্ডারেও আসিফ মাহমুদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।
এ ছাড়া গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগারের তৃতীয় ধাপ এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়েও অভিযোগ করা হয়েছে। বিশেষ করে শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরের একটি গ্রামীণ অবকাঠামো প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়টিও অনুসন্ধানে এসেছে।
দুদকের অনুসন্ধানে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগে ১০ কোটি টাকা ঘুষের অভিযোগও রয়েছে। একইভাবে এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে নিয়োগে ৫২ কোটি এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগে ৬৫ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগের মধ্যে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের কথা বলা হয়েছে। চার দেশে মোট ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার করে বিলাসবহুল ভিলা কেনা ও ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখার অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।
অভিযোগে আসিফ মাহমুদের দুই বোনের স্বামী ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে অর্থপাচারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি তার বাবা বিল্লাল হোসেন, এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন ও পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, প্রভাব খাটিয়ে অর্থ আদায়, ঘুষের তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে।
হেলিকপ্টারে কম্বল বিতরণের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয়, বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর স্থানে গুলিভর্তি ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও গাড়ি ব্যবহার এবং পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত যাতায়াতের বিষয়ও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করা হবে বলে জানিয়েছে দুদক।
এর আগে আসিফ মাহমুদ ছাড়াও সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্মসচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন ও উপসচিব মো. মাসুম আহমেদের বিরুদ্ধে পৃথক অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। ওই অনুসন্ধানে ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল ও পদায়নে ৭৬ লাখ টাকা, ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতিতে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং পছন্দের স্থানে পদায়নের জন্য ২ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের টেন্ডার, কেনাকাটা ও অন্যান্য কার্যক্রমে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগও আগের অনুসন্ধানে উঠে আসে। নতুন অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় এখন একাধিক মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন প্রকল্প, নিয়োগ-পদায়ন এবং বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ একসঙ্গে যাচাই করবে দুদক।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)