Logo
×

Follow Us

রাজনীতি

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে: রিজভী

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে: রিজভী

সংগৃহীত ছবি

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং রাজপথে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) আয়োজিত ‘সাম্প্রতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট-সরকার ও জনগণের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

রিজভী বলেন, বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সরকারের তৈরি নয়। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, এলএনজি আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা এবং মহেশখালীর গ্যাস টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। তবে সংকট মোকাবিলায় সরকার নিষ্ক্রিয় নয়; বরং প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকারের নিজস্ব উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু সেসব উদ্যোগকে উপেক্ষা করে রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। লকডাউন বা বিভিন্ন কর্মসূচির নামে রাজপথ দখলে রাখার হুমকিও গণতান্ত্রিক সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে বিএনপির এই নেতা বলেন, গণতন্ত্রে সরকারের সমালোচনা করা বিরোধী দলের অধিকার। সরকারের প্রতিটি কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। তবে সেই সমালোচনা গঠনমূলক হওয়া প্রয়োজন। একই সাথে বিরোধী দলকেও সংকটের সমাধানে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে রিজভী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়েছে। হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরকে কেন্দ্র করে সংঘাতের কারণে সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের আমদানি করা এলএনজির বড় একটি অংশও এই পথ দিয়ে আসে।

তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কোথাও মাইন পাতা হচ্ছে, আবার কার্গো জাহাজে হামলার ঘটনাও ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে এলএনজি আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ, বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাস দেওয়া, শিল্পকারখানা সচল রাখা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বর্তমান সংকটকে কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখলে বাস্তব পরিস্থিতি পুরোপুরি বোঝা যাবে না।

সংকট মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে রিজভী বলেন, অতীতের ব্যর্থতার কথা বলে সরকার বসে নেই। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত গ্যাস সংগ্রহের জন্য প্রতিবেশী ও নিকটবর্তী দেশগুলোর সাথেও যোগাযোগ করা হচ্ছে। মিয়ানমার, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টার্মিনালটির সমস্যা সমাধানে মেরামতের কাজ চলছে। একদিকে বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে এলএনজি সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা, অন্যদিকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি—দুই পরিস্থিতির সম্মিলিত প্রভাবেই বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।

রিজভী বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল সরকারের সমালোচনা করলে সংকটের কথা বলার পাশাপাশি সমাধানের পথও দেখাতে হবে। বিরোধী দলের দায়িত্ব শুধু সমস্যা তুলে ধরা নয়, প্রয়োজনে বাস্তবসম্মত সমাধানের রূপরেখাও দেয়া।

তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে গত ১৭ বছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অনিয়মের প্রভাবও রয়েছে। তাঁর দাবি, আগের সরকার এমন অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছিল, যেগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি চার্জ পেয়েছে। এতে জাতীয় কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।

এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানার সঙ্গে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলেও অভিযোগ করেন বিএনপির এই নেতা। তাঁর ভাষ্য, জনগণের অর্থ ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে আর্থিকভাবে লাভবান করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

ব্যাংক খাতের প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, জনগণের অর্থ সেখান থেকেও তুলে নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তি দিতে ইনডেমনিটি আইন করা হয়েছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর মতে, এর ফলে অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সীমিত করা হয়েছিল।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে রিজভী বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থাকায় দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বারবার আঘাতের মুখে পড়েছে। উচ্চতর আদালত, গণমাধ্যম, পুলিশ প্রশাসন, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে।

তিনি বলেন, দেশে নতুন একটি নির্বাচন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় পুলিশ প্রশাসনসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই এসব প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থের বাইরে রেখে দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করা জরুরি।

শিশু নিখোঁজের প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, কয়েক মাসের ব্যবধানে ১৫ হাজার শিশু নিখোঁজ হওয়ার মতো ঘটনা উদ্বেগজনক। পুলিশ প্রশাসন অনেক শিশুকে খুঁজে বের করতে সক্ষম হলেও এ ধরনের ঘটনা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, পুলিশকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক মতের কারণে কাউকে আটক করা কিংবা পরিচয়ের ভিত্তিতে আইন প্রয়োগের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে রিজভী অভিযোগ করেন, আগের শাসনামলে গণমাধ্যমের মালিকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্য, আত্মীয়তা বা ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে গণমাধ্যমের লাইসেন্স দেওয়ার প্রবণতার মাধ্যমে শাসন ও দুঃশাসনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শিশু, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জীবন দিয়ে যে আন্দোলন করেছে, তার অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

রিজভী বলেন, দলীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উপেক্ষা করা হলে বিভাজন আরও বাড়বে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে নতুন প্রজন্মের ওপর। দেশের উন্নয়নে দলীয় সংকীর্ণতার বাইরে গিয়ে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা শোনা প্রয়োজন।

চলমান বিদ্যুৎ সংকটে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছেন। সরকার তার দায়িত্ব পালন করবে, পাশাপাশি নাগরিক হিসেবেও প্রত্যেকের কিছু দায়িত্ব রয়েছে।

তিনি বলেন, সংকটকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে জনগণকে বিভ্রান্ত না করে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে। একই সাথে সরকারকে নেওয়া উদ্যোগ আরও কার্যকর করতে হবে এবং বিরোধী দলসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন, শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক করার ওপরও গুরুত্ব দেন রিজভী। তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলেই গণতন্ত্র সুসংহত হবে এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম এমপি। জাসাসের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য চিত্রনায়ক হেলাল খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামরুল আহসান, জাসাসের সদস্য সচিব জাকির হোসেন রোকন, বিএনপির সহসাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক সাইদ সোহরাব, স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর শরাফত আলী সফু, গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক শামিমুর রহমান শামিমসহ অনেকে।

মন্তব্য করুন