গণতন্ত্রে বিএনপি সবসময় আপসহীন: মাহ্দী আমিন
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০৭ পিএম
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।
সময় ও প্রজন্মের পরিবর্তন হলেও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং গণতন্ত্রের প্রশ্নে বিএনপি কখনো আপস করেনি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি জাতীয় সংকটে বিএনপি জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে।
সোমবার দুপুরে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ‘জিয়া স্মৃতি বইমেলা ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন মাহ্দী আমিন। বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জিয়া স্মৃতি পাঠাগার ও জাতীয়তাবাদী প্রকাশনা সংস্থা এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মাহ্দী আমিন বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আধুনিক রাষ্ট্রদর্শন ধারণ করে মেধাভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। দেশপ্রেমিক ছাত্র সংগঠন হিসেবে ছাত্রদল পাশে থাকলে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কোনো অপশক্তি বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বিএনপির রাজনৈতিক ভূমিকা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতীয় সংকটের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলটি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। তার ভাষ্য, দেশে যখনই গণতন্ত্র বিপন্ন হয়েছে, তখনই বিএনপি তা পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। শহীদ জিয়াউর রহমান বাকশাল-পরবর্তী সময়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং বেগম খালেদা জিয়া স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে আরও সুসংহত করার কাজ চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।
বাকস্বাধীনতা ও রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপির ভূমিকা প্রসঙ্গে মাহ্দী আমিন বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশে দলটির ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। তার দাবি, শহীদ জিয়াউর রহমান বন্ধ থাকা গণমাধ্যমগুলো উন্মুক্ত করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে উন্মুক্ত গণমাধ্যম ও তথ্যপ্রযুক্তির সুফল পেতে শুরু করে বাংলাদেশ। বর্তমান সরকার এমন একটি পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে, যেখানে মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকবে।
তবে বাকস্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে অপপ্রচার ও অশালীনতার বিরুদ্ধে সতর্ক করেন তিনি। মাহ্দী আমিন বলেন, একটি কুচক্রী মহল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুযোগ ব্যবহার করে মিথ্যাচার ও উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়াচ্ছে। বাকস্বাধীনতার নামে চরম অশালীনতা ও মিথ্যাচার চালানো হলে আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলটি ক্ষমতায় থাকলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মর্যাদা সমুন্নত রেখে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে। তার দাবি, শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া সার্ক ও ওআইসিতে বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করেছিলেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে সেই আত্মমর্যাদাশীল পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা ফিরে এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, বিএনপিই বাংলাদেশের আধুনিক রাষ্ট্র সংস্কারের অন্যতম প্রধান রূপকার। শহীদ জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’ এবং তারেক রহমানের ২৭ ও ৩১ দফার ভিত্তিতে একটি সমৃদ্ধ ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিএনপি ও এর প্রতিষ্ঠাতার সাথে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক ইতিহাস গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চরম ঝুঁকি নিয়ে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সিপাহী-জনতার বিপ্লবের প্রসঙ্গ তুলে মাহ্দী আমিন বলেন, ওই সময় দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেছিলেন। পরে তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় পরিচয়ের বিভিন্ন স্তরে জিয়াউর রহমান ও বিএনপির অবদান রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির নেতাকর্মীদের আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, একক রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে বিএনপি সবচেয়ে বেশি রক্ত ও আত্মত্যাগ করেছে। তার দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির ৪২০ জনের বেশি নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন। শুধু ছাত্রদলেরই ১৪০ জনের বেশি নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি, মত ও আদর্শের পার্থক্য ভুলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মূল দর্শন। এ দর্শনে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরের পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, ওই সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসন ও সরকারি ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তারেক রহমানের নির্দেশনায় বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠে নেমেছিলেন। তাদের ভূমিকার কারণেই সে সময় দেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ধর্মীয় নেতাদের মর্যাদা প্রসঙ্গে মাহ্দী আমিন বলেন, বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সময় সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থার বিষয়টি সংযুক্ত করা হয়। বেগম খালেদা জিয়ার সময় আলেম-ওলামা ও মাশায়েখদের রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্মানজনকভাবে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। বর্তমানে তারেক রহমানের নির্দেশনায় ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিবসহ সব ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের যথাযথ সম্মান ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
দেশের অর্থনীতির বিকাশে বিএনপির ভূমিকা তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, তৈরি পোশাক খাত ও বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি দেশের অর্থনীতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি, যার বিকাশে শহীদ জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল। খাল খনন, সবুজ বিপ্লব, গ্রাম সরকার ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মতো উদ্যোগও তার সময় নেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। বর্তমান সরকারের ‘কৃষক কার্ড’ ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’কে বিএনপির গণমুখী রাজনীতির ধারাবাহিকতা হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে তিনি বলেন, গ্রামীণ মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে শহীদ জিয়াউর রহমান উপজেলা পর্যায়ে ৩১ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরে বেগম খালেদা জিয়া সেগুলো ৫০ শয্যায় উন্নীত করেন। বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো পর্যায়ক্রমে ১৫১ শয্যার আধুনিক হাসপাতালে রূপান্তরের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, জিয়া স্মৃতি পাঠাগারের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা হাবিবা, বিএনপির নির্বাহী কমিটির স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসম্পাদক আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল এবং জিয়া স্মৃতি পাঠাগারের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. জহির দীপ্তিসহ সংশ্লিষ্ট নেতারা।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)