জিয়া থেকে খালেদা-তারেক: চার যুগের রাজনীতিতে বিএনপির উত্থান-পতন
প্রকাশ প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম
জিয়া থেকে খালেদা-তারেক: চার যুগের রাজনীতিতে বিএনপির উত্থান-পতন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ৪৮ বছর কম সময় নয়। এই সময়ে বদলেছে সরকার, বদলেছে রাজনৈতিক সমীকরণ, এসেছে সামরিক শাসন, গণআন্দোলন, নির্বাচন, ক্ষমতার পালাবদল এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার নানা সংকট। এসব পরিবর্তনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে কোনো না কোনোভাবে উপস্থিত ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠার পর দলটি কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, কখনো দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থেকে রাজপথে আন্দোলন করেছে। কখনো নেতৃত্ব সংকটে পড়েছে, আবার কখনো কঠিন রাজনৈতিক চাপ সামলে নতুন করে সংগঠিত হয়েছে। চার যুগের এই পথচলায় বিএনপির ইতিহাস তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরে এসে দলটির সামনে এখন আরেকটি বড় প্রশ্ন: অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে?
রমনা গ্রিন থেকে শুরু
১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিবর্তিত বাস্তবতায় জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তিকে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত হয় জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল-জাগদল। পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মতের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট। এই ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে ১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হন জিয়াউর রহমান।
এর কয়েক মাস পর ১ সেপ্টেম্বর রমনা গ্রিনে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়।
শুরু থেকেই দলটি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতির ধারণাকে সামনে আনে। প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের রাজনীতিতে বিএনপি একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।
১৯ দফায় ছিল উৎপাদন ও স্বনির্ভরতার লক্ষ্য
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি শহীদ জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা এবং বেসরকারি খাতকে বিকশিত করার ওপর এতে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
‘খাল কাটা কর্মসূচি’, গণশিক্ষা এবং পল্লী বিদ্যুতায়নের মতো উদ্যোগ তখনকার গ্রামীণ বাংলাদেশে আলোচনার জন্ম দেয়।
এই সময় পোশাকশিল্পের বিকাশ ও জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রেও যে ভিত্তি তৈরি হয়, পরবর্তী সময়ে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যু, খালেদা জিয়ার উত্থান
১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপি বড় ধরনের নেতৃত্ব সংকটে পড়ে। সেই সংকটের সময়ে দলের হাল ধরেন খালেদা জিয়া।
১৯৮২ সালে এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণের পর শুরু হয় সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন। বিএনপির নেতৃত্বে খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় রাজপথে অবস্থান করেন। নানা রাজনৈতিক চাপ ও গৃহবন্দিত্বের মধ্যেও তিনি আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।
১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের পতনের পর নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে এবং খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।
পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। বিশেষ করে ২০০১ সালের নির্বাচনে বড় জয় দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
ক্ষমতার বাইরে দীর্ঘ লড়াই
বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাসের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে বিরোধী রাজনীতি। ক্ষমতায় থাকার সময় যেমন রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা হয়েছে, তেমনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে আন্দোলন ও সাংগঠনিক সংগ্রাম চালাতে হয়েছে দলটিকে।
২০০৭ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় বিএনপির নেতৃত্ব বড় চাপের মুখে পড়ে। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপি কঠোর রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে পড়ে।
বিএনপির দাবি, এই সময়ে তাদের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী মামলা, গ্রেপ্তার, হামলা, গুম ও হত্যার শিকার হয়েছেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি করা হয় এবং তারেক রহমান দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করেন।
দলের নেতাদের ভাষ্য, এত প্রতিকূলতার মধ্যেও সংগঠনটি ভেঙে পড়েনি। বরং দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি আরও বিস্তৃত হয়েছে।
১৯ দফা পেরিয়ে ৩১ দফা
চার দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিএনপিও তার রাজনৈতিক রূপরেখায় পরিবর্তন এনেছে।
২০১৭ সালে খালেদা জিয়া ঘোষণা করেন ‘ভিশন ২০৩০’। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে তারেক রহমান ঘোষণা করেন ‘৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার রূপরেখা’।
এই রূপরেখায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিএনপির নেতাদের মতে, জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা ছিল স্বনির্ভর ও উৎপাদনশীল রাষ্ট্র গঠনের কর্মসূচি। আর ৩১ দফা হলো পরিবর্তিত সময়ের বাংলাদেশে রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের পরিকল্পনা।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান বদলে দেয় রাজনৈতিক সমীকরণ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল বদলে যায়।
দীর্ঘদিনের বিরোধী দল বিএনপি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সামনে আসে। দলটির নেতারা দাবি করেন, দীর্ঘ ১৫ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং রাজপথের অভিজ্ঞতা এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে পরিবর্তিত বাস্তবতায় বিএনপির সামনে নতুন দায়িত্বও তৈরি হয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা এখন দলটির জন্য বড় পরীক্ষা।
জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্মের নেতৃত্ব
বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে জিয়া পরিবারের নাম গভীরভাবে যুক্ত।
প্রথম প্রজন্মে প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। দ্বিতীয় প্রজন্মে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তৃতীয় প্রজন্মে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
জিয়াউর রহমান দল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন। তার মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া দলকে নেতৃত্ব দেন এবং এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপিকে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেন।
অন্যদিকে তারেক রহমান দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থেকেও দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং ৩১ দফার মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের রাজনৈতিক রূপরেখা সামনে আনেন।
বিএনপি নেতাদের কাছে এই তিন প্রজন্মের নেতৃত্ব দলটির ধারাবাহিকতার প্রতীক।
জিয়া পরিবারের ওপর রাজনৈতিক আঘাত
বিএনপির নেতাদের অভিযোগ, দলটির প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জিয়া পরিবার বিভিন্ন রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে পড়েছে।
১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্বে আসেন। পরবর্তীতে ১/১১-এর সময় এবং আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ মেয়াদে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান বিভিন্ন মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি হন।
খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাসজীবন বিএনপির রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।
তবে দলের নেতারা মনে করেন, এসব চাপ জিয়া পরিবারের প্রতি বিএনপির নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক আনুগত্যকে দুর্বল করতে পারেনি।
তারেক রহমানের সামনে নতুন পরীক্ষা
দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের পর তারেক রহমান এখন বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে। প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি।
বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এখন ৩১ দফা একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। রাষ্ট্র সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কারের মতো বিষয়কে সামনে রেখে দলটি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কাঠামোর একটি রূপরেখা দিতে চাইছে।
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক বলেন, শহীদ জিয়ার ১৯ দফার উৎপাদনমুখী দর্শন, খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং তারেক রহমানের ৩১ দফার সমন্বয়েই আগামী দিনের বাংলাদেশ নির্মাণের পথ তৈরি হবে।
৪৮ বছর পর বিএনপির সামনে কী?
৪৮ বছরের রাজনৈতিক পথচলায় বিএনপি যেমন সাফল্য পেয়েছে, তেমনি সমালোচনা ও বিতর্কও দলটির ইতিহাসের অংশ। ক্ষমতায় থাকার সময় রাষ্ট্র পরিচালনার নানা অভিজ্ঞতা যেমন রয়েছে, তেমনি বিরোধী দলে থেকে আন্দোলন-সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসও রয়েছে।
এখন দলটির সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো অতীতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যকর পরিকল্পনায় রূপ দেওয়া।
গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, আইনের শাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা নিশ্চিত করা হবে যে কোনো সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। বিএনপির জন্যও তার ব্যতিক্রম নয়।
বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুর ভাষায়, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক মুক্তিই সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। জনগণের সমর্থন নিয়ে এসব মোকাবিলায় বিএনপি এগিয়ে যেতে চায়।
প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পর বিএনপি তাই এখন ইতিহাসের আরেকটি সন্ধিক্ষণে। জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা থেকে খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, সেখান থেকে তারেক রহমানের ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা, দীর্ঘ এই অভিযাত্রা দলটিকে বারবার নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।
এখন সময়ের প্রশ্ন একটাই: চার যুগের আন্দোলন, অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে বিএনপি কতটা কার্যকর রাষ্ট্রনীতি ও সুশাসনে রূপ দিতে পারে।
সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির পরবর্তী অধ্যায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)