ডেঙ্গু মোকাবিলায় দেশজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা জোরদার
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৬ পিএম
ডেঙ্গু মোকাবিলায় দেশজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা জোরদার
দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজধানীসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে শয্যা, ডায়াগনস্টিক কিট, ওষুধ ও স্যালাইনের সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা, ডেডিকেটেড ওয়ার্ড এবং ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ২৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে মৃত্যুহার দাঁড়িয়েছে ০.৩১ শতাংশে, যা গত তিন বছরের তুলনায় সর্বনিম্ন। ২০২৩ সালে ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুতে হার ছিল ০.৫৩ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৪৮২ জনের মৃত্যুতে ০.৪৯ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৩২৩ জনের মৃত্যুতে ০.৩৪ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে মৃত্যুহার ছিল ০.৪২ শতাংশ।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সহজলভ্য চিকিৎসা, সচেতনতামূলক কর্মসূচি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং হাসপাতালভিত্তিক প্রস্তুতির কারণে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার কমিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিশেষভাবে ডেঙ্গু এনএস১ পরীক্ষা বিনামূল্যে করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য দুটি ফ্লোরকে বিশেষায়িত ওয়ার্ডে রূপান্তর করা হয়েছে। এতে হাসপাতালটির ডেঙ্গু শয্যা ৬০ থেকে বেড়ে ২০০টিতে দাঁড়িয়েছে। ৬ অক্টোবর পর্যন্ত সেখানে ২২৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। রোগীদের ওয়ার্ডের বাইরে না নিয়েই পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়ার জন্য চালু করা হয়েছে ওয়ান স্টপ সার্ভিস।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ডে চিকিৎসা চলছে। ৬ অক্টোবর পর্যন্ত সেখানে ২৩১ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। ৪০২, ৫০২ ও ৭০২ নম্বর ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে; এর মধ্যে ৭০২ নম্বর ওয়ার্ড নারী রোগীদের জন্য নির্ধারিত। প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত শয্যার পাশাপাশি অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
ঢামেকে ডেঙ্গু চিকিৎসায় আইভি ফ্লুইড, আইভি সেট, প্যারাসিটামল, বমি ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ এবং প্লাজমা সলিউশনের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কুর্মিটোলা মাল্টিকেয়ার স্পেশালাইজড হাসপাতালেও রোগীর চাপ সামাল দিতে নতুন করে ১০০ শয্যা চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫০টি পুরুষ এবং ৫০টি নারী রোগীর জন্য। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ডেঙ্গু চিকিৎসায় সহায়তার জন্য সেখানে ছয়জন চিকিৎসক ও ১০ জন নার্সও নিয়োগ দিয়েছে। ১ হাজার ২০০ শয্যার হাসপাতালটিতে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ১০৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। জরুরি বিভাগের ৫০টি শয্যার পাশাপাশি প্রায় ২০০টি শয্যা ডেঙ্গু রোগীদের জন্য রাখা হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত সবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন নেই। রক্তপাত, তীব্র ডায়রিয়া বা অনিয়ন্ত্রিত বমির মতো জটিল উপসর্গ দেখা দেয়া প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য ভর্তি করা হয়।
এদিকে ডেঙ্গু সংক্রমণের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হটস্পট হিসেবে খুলনায়ও চিকিৎসা প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নয়টি বিনামূল্যের মেডিকেল ক্যাম্প চালুর পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে সপ্তাহজুড়ে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়েছে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চারটি ওয়ার্ড ও সংলগ্ন বারান্দায় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা চলছে। খুলনা সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক দিনের বেতনের অর্থে হাসপাতালে ৩০টি শয্যা দেয়া হয়েছে। এতে হাসপাতালটির ডেঙ্গু চিকিৎসা সক্ষমতা বেড়ে ১৫০ শয্যায় দাঁড়িয়েছে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, রাজধানীতে রোগীর চাপ আরো বাড়লে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ফিল্ড হাসপাতাল পুনরায় চালুর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরিতে বার্ন ইউনিটের কিছু রোগীকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তরের পরিকল্পনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
আগামী দিনের চাহিদা বিবেচনায় স্যালাইনের মজুত বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপো (সিএমএসডি) ও এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডকে পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইডস কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ সম্প্রতি পাঁচ লাখ ডেঙ্গু এনএস১ র্যাপিড ডায়াগনস্টিক টেস্ট কিট পেয়েছে। ফলে দেশের যেকোনো এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লেও দ্রুত পরীক্ষা করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
ডেঙ্গু চিকিৎসায় ভুল ব্যবস্থাপনা কমাতে ২০২৫ সালের চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুসারে ইতোমধ্যে ১ হাজার ৬০০ চিকিৎসককে ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনার ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। একই সাথে হাসপাতালে থাকা রোগীদের মশারি ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হচ্ছে, যাতে চিকিৎসাকেন্দ্র থেকেই নতুন করে ডেঙ্গু সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)