সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফে স্বস্তি পেলেন ১৪ লাখ কৃষক
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫১ পিএম
ছবিঃ বাসস
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ আসল ও সুদসহ মওকুফ করেছে। এতে মোট ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকার ঋণের দায় থেকে মুক্তি পেয়েছেন প্রান্তিক কৃষকেরা। সরকারের এ উদ্যোগে কৃষকদের আর্থিক চাপ কমার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কৃষিপণ্যের বাজারদরের ওঠানামায় এমনিতেই চাপে ছিলেন অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি। তার ওপর ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে খেলাপি হওয়ায় নতুন করে ব্যাংকঋণ পাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছিল তাদের। ঋণ মওকুফের ফলে সেই সংকট কাটিয়ে নতুন করে কৃষিকাজে মনোযোগ দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন তারা।
সরকারের এ কর্মসূচির আওতায় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের সম্পূর্ণ আসল ও সুদ মওকুফ করা হয়েছে। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে নেওয়া এ সিদ্ধান্তকে প্রান্তিক কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, এর ফলে অনেক কৃষক উচ্চ সুদের মহাজনি ঋণ বা দাদন ব্যবসার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসতে পারবেন।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি। এ উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লে দেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তা আরো শক্তিশালী হবে।
তিনি বলেন, কৃষকদের দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী করতে উৎপাদন খরচ কমানো, প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সরবরাহ এবং ভর্তুকি নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোতে অগ্রাধিকার দেয়া জরুরি। দেশের খাদ্য চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যসংকট তৈরি হলে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোও বেশি দামে খাদ্য বিক্রি করতে পারে। অতীতেও এমন পরিস্থিতির নজির রয়েছে। তাই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
অধ্যাপক আবু আহমেদ আরো বলেন, ঋণ মওকুফের মাধ্যমে কৃষকদের সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অনেক কৃষকের ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার, ৩০ হাজার কিংবা ৫০ হাজার টাকা বা তারও বেশি। তবে সীমিত অঙ্কের এই ঋণ মওকুফও তাদের জন্য উল্লেখযোগ্য আর্থিক স্বস্তি নিয়ে এসেছে।
যশোর সদর উপজেলার কয়েকজন কৃষকের অভিজ্ঞতায়ও উঠে এসেছে এই উদ্যোগের প্রভাব। উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়নের নারাঙ্গলী গ্রামের কৃষক ফারুক হোসেন বাসসকে জানান, ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে দুশ্চিন্তায় ছিলেন তিনি। ঋণ পরিশোধের জন্য বাড়ির গাছ কিংবা গোয়ালের গরু বিক্রির কথাও ভাবতে হয়েছিল। কিন্তু সরকার ঋণ মওকুফ করায় শেষ পর্যন্ত এসব সম্পদ বিক্রি করতে হয়নি। তার ভাষায়, ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পাওয়ায় বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছেন তিনি।
একই উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ঝাউদিয়া গ্রামের কৃষক মো. মহিউদ্দিন জানান, ১০ হাজার টাকা ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে দীর্ঘদিন চাপে ছিলেন। নির্বাচনের আগে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে এ ঋণ মওকুফের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করায় তিনি স্বস্তি পেয়েছেন। বিক্রি করার মতো সম্পদ না থাকায় ঋণ পরিশোধের সামর্থ্যও তার ছিল না বলে জানান তিনি। এ ছাড়া চাঁচড়া ইউনিয়নের রূপদিয়া গ্রামের ইদ্রিস আলী এবং আরবপুর ইউনিয়নের মালঞ্চী গ্রামের হায়দার আলীও ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
ব্যাংকভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, এ কর্মসূচির সবচেয়ে বড় অংশ বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। ব্যাংকটির মাধ্যমে ৭ লাখ ৯ হাজার ৬৭৯ জন কৃষকের ৬০৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা মওকুফ করা হয়েছে। অন্যদিকে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে আরো ৭ লাখ ২৪ হাজার ৮০৩ জন কৃষক এ সুবিধা পেয়েছেন। তাঁদের জন্য মওকুফ করা হয়েছে প্রায় ৭৪৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করে ঋণ মওকুফের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। কৃষকদের বাড়তি হয়রানি এড়াতে ব্যাংকগুলো সরাসরি এ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান ১১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। অথচ ওই সময়ে কৃষি ও পল্লি খাতে ঋণ বিতরণের জন্য ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ও অগ্রিমের মাত্র ২ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং নিট ঋণ ও অগ্রিমের ২ দশমিক ৯৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, জিডিপির প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কৃষি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোর নিট ঋণ ও অগ্রিমের ৪ শতাংশ এই খাতে বিতরণের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় নতুন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো কৃষি ও পল্লি খাতে ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। ওই অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৯ হাজার কোটি টাকা। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৫ হাজার ৫০৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, যা ১৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে যেসব কৃষক ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ পাচ্ছিলেন না, তারা মওকুফের পর আবারও প্রাতিষ্ঠানিক ঋণসুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারবেন। একই সাথে সরকার সরাসরি ব্যাংকগুলোর মওকুফ করা অর্থ পরিশোধ করায় গ্রামীণ পর্যায়ের ব্যাংক শাখা ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। এতে কৃষি খাতে নতুন ঋণপ্রবাহ বাড়ার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গতি সঞ্চার হওয়ার আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)