পাঁচ বছরে এক কোটি দক্ষ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা সরকারের
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২৩ পিএম
ছবিঃ বাসস
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ, নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে বহুমুখী কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত বাজারের বাইরে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকারের বৈশ্বিক কর্মসংস্থান কৌশলে নতুন ও অপ্রচলিত শ্রমবাজার অনুসন্ধানকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। এ জন্য তরুণ ও যুবকদের আন্তর্জাতিক চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি ও পেশাগত প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য শুধু বিদেশে কর্মী পাঠানো নয়, বরং তাঁদের জন্য ভালো বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং আইনি সুরক্ষাসহ মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ পরিকল্পনার আওতায় নতুন শ্রমবাজার তৈরি, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, অভিবাসন ব্যয় কমানো, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ এবং কর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ইউরোপের ইতালি, জার্মানি, গ্রিস ও রোমানিয়ার পাশাপাশি জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোতে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশের সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সরকারের এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে দেশজুড়ে বর্তমানে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) কাজ করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে তথ্যপ্রযুক্তি, আধুনিক ড্রাইভিং, নার্সিং, কেয়ারগিভিং, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল ও হসপিটালিটি খাতসহ মোট ৫৫টি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিদেশে চাকরির ক্ষেত্রে ভাষাগত দক্ষতার গুরুত্ব বিবেচনায় ইংরেজির পাশাপাশি জাপানি, কোরিয়ান, জার্মান ও আরবি ভাষায় বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রশিক্ষণের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে বিভিন্ন দেশের স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ সনদ প্রদান এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা অর্জন করতে পারলে বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ ও আয়ের সম্ভাবনা বাড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ১০ দশমিক ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ প্রবাহ ১১ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং আরো বাড়াতে অদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে প্রশিক্ষিত ও কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী পাঠানোর ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।
মালয়েশিয়া ও জাপানের শ্রমবাজারে নতুন সুযোগ
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে একটি রূপরেখা তৈরি হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় ৩৩৮টি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের বিশেষ অনুরোধে বিনা অভিবাসন ব্যয়ে ১০ হাজার কর্মী নিয়োগে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে মালয়েশিয়া। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) তত্ত্বাবধানে এ বিশেষ পাইলট কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, জাপানের সাথে নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী নিয়োগের (এসএসডব্লিউ) চুক্তির আওতায় বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। জাপানি ভাষায় দক্ষতা ও নির্ধারিত কারিগরি যোগ্যতা অর্জনকারী কর্মীরা দেশটির বয়স্কদের সেবাযত্ন, তথ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণ, কৃষি ও আতিথেয়তা খাতে কাজ করতে পারবেন। এ ব্যবস্থায় কর্মীদের আইনি সুরক্ষা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইউরোপের শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ
ইউরোপে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থান বাড়াতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) যৌথভাবে ‘সাপোর্টিং আ ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ উইথ বাংলাদেশ’ শীর্ষক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ থেকে দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী, প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মী পাঠানো এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
এ কর্মসূচিতে বোয়েসেল গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে অনলাইন ডেটাবেজ ব্যবহার করে ইউরোপীয় নিয়োগদাতাদের সঙ্গে দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
ইতালিতেও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির কার্যক্রম চলছে। দেশটির সরকারের অর্থায়নে বাংলাদেশে বিনা খরচে প্রাক্-প্রস্থান প্রস্তুতি, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিক্ষা কর্মসূচি চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে অভিজ্ঞ কর্মীদের ইতালিতে কাজের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা খাতেও অনুমোদিত নিয়োগকর্তাদের স্পনসরশিপ ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশি নার্স ও কেয়ারগিভারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে জার্মানির ‘অপরচুনিটি কার্ড’ বা ‘চান্সেনকার্টে’ কর্মসূচির মাধ্যমে যোগ্য তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও প্রকৌশলীরা দেশটিতে চাকরি অনুসন্ধানের সুযোগ পাচ্ছেন।
এ ছাড়া রোমানিয়া, গ্রিস, সার্বিয়া, পর্তুগাল, ক্রোয়েশিয়া ও হাঙ্গেরির কৃষি, সরবরাহব্যবস্থা, ডেলিভারি এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ওশেনিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলেও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
ইউরোপের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের শ্রমবাজারেও বাংলাদেশি কর্মীদের সুযোগ সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে। এসব দেশে কৃষি, নির্মাণ এবং মোটরযান মেরামত খাতে নির্দিষ্ট কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশিদের কাজের সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া রাশিয়া ও ইউরেশিয়ার বিভিন্ন দেশের পোশাক ও উৎপাদনশিল্পে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের চাহিদা রয়েছে। মালদ্বীপ ও সেশেলসের পর্যটন, আবাসন এবং নির্মাণ খাতেও বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে।
অভিবাসন ব্যয় কমানো ও নিরাপত্তায় গুরুত্ব
বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচ ও প্রতারণা বন্ধ করতে ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়াচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশেষ ‘মাইগ্র্যান্ট কার্ড’ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রবাসীদের ব্যাংকিং সুবিধা, বিমা সুরক্ষা এবং বিদেশে জরুরি আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সাথে অবৈধ মধ্যস্বত্বভোগীদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশ যাওয়া নিরুৎসাহিত করতে আইনি পদক্ষেপ জোরদার করা হচ্ছে। সরকারি বৈধ চ্যানেলে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (টিভিইটি) ব্যবস্থায়ও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিদেশি ভাষা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠানোর এ উদ্যোগ সফল হলে একদিকে দেশের বেকারত্ব কমবে, অন্যদিকে বাড়বে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার আয়। তবে এক কোটি কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য অর্জনে প্রশিক্ষণের মান, নিয়োগে স্বচ্ছতা, অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশে কর্মীদের অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হবে সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
সুত্রঃ বাসস
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)