Logo
×

Follow Us

জাতীয়

জাপানের সাথে জ্বালানি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়াতে চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২০ পিএম

জাপানের সাথে জ্বালানি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়াতে চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ছবিঃ পিএমও

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত, প্রযুক্তির বিকাশ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সাথে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টায় টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কান্তেইয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে এসব বিষয় উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন বৈঠকের বিষয়গুলো জানান।

বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও শিল্পায়নের লক্ষ্যে জাপান সরকার এবং দেশটির বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আরো সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান তারেক রহমান। বাংলাদেশকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথমদিকের স্বীকৃতিদানকারী দেশগুলোর একটি হিসেবে জাপানের অবদানের কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা, শান্তি ও সমৃদ্ধির অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এ সময় তিনি তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দুইবার জাপান সফর এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁদের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি।

বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে জাপানের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় সাম্প্রতিক ৫০ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন তারেক রহমান। এ উদ্যোগের মাধ্যমে জাপানের কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সাথে বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তা এবং দক্ষ প্রযুক্তিকর্মীদের সংযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। প্রস্তাবিত টেক পার্কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি মহাকাশবিজ্ঞান, স্যাটেলাইট প্রকৌশল ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে জাপানের সাথে সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।

অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং দেশব্যাপী উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এসব বৃহৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা, কারিগরি সহায়তা, বিনিয়োগ ও অর্থায়নে জাপানের সহযোগিতা চান তিনি। জাপানের আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা ও অবকাঠামো উন্নয়নের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তারেক রহমান।

বৈঠকে জ্বালানি, অবকাঠামো ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। এ পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে দ্রুত বাংলাদেশে জাপানি প্রতিনিধিদল পাঠানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের জন্য জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, করনীতি, শুল্ক ছাড়করণ এবং অর্থ স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াতে সরকার কাজ করছে।

বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত কার্যকর করার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তারেক রহমান। তার মতে, চুক্তির সুফল দুই দেশের জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে উভয় পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে আলোচনায় জাতিসংঘ, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এবং রোহিঙ্গা সংকট গুরুত্ব পায়। প্রধানমন্ত্রী বহুপাক্ষিক সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি দুই দেশের অভিন্ন অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচনে জাপানের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। একই সাথে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং একটি অবাধ, উন্মুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়ে তুলতে জাপানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

মিয়ানমারের অবনতিশীল পরিস্থিতি এবং এর ফলে সৃষ্ট রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুতি সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ, নির্বিঘ্নে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানান। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সহায়তায় জাপানের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি রাখাইনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় দেশটির সক্রিয় সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার অনুরোধ করেন। তারেক রহমান বলেন, সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত। রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

শীর্ষ বৈঠকের সমাপনী বক্তব্যে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের অগ্রাধিকারভিত্তিক ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মন্ত্রীপর্যায়ের একটি যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, এ কমিশন দুই দেশের সহযোগিতার সুযোগগুলোকে বাস্তব উদ্যোগে রূপ দিতে এবং অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হবে। গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের অভিন্ন লক্ষ্য আরও সুদৃঢ় হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বৈঠক শেষে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান তারেক রহমান। পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও অভিন্ন সমৃদ্ধির ভিত্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আগামী দিনে আরো বিস্তৃত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

মন্তব্য করুন