প্রধানমন্ত্রীর সফরে মোংলা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
সুন্দরবন, মোংলা বন্দর, নৌঘাঁটি ও প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন শেষে ঢাকার উদ্দেশে মোংলা ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিকাল ৫টায় মোংলা হেলিপ্যাড থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। তাদের প্রত্যাশা, মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণসহ আটকে থাকা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে নতুন গতি আনবে।
সকালে হেলিকপ্টারে সুন্দরবন পরিদর্শন শেষে বেলা সাড়ে ১০টার দিকে খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করেন সরকার প্রধান। পরে নৌপথে বানৌজা মোংলায় পৌঁছান তিনি।সেখানে ওয়ার্ডরুমে নৌবাহিনী, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় করেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আব্দুল্লাহ হারুন, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিপ আহমেদ মোস্তফা, বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন, পুলিশ সুপার মো. জামিরুল ইসলাম এবং নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সভা ও মধ্যাহ্নভোজ শেষে বিকালে মোংলা বন্দর জেটি পরিদর্শন করেন তারেক রহমান। এরপর প্রস্তাবিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শনে যান তিনি। পথে সড়কের পাশে অপেক্ষমাণ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সাথে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের সাথে হাত মেলান।
দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর প্রধানমন্ত্রীর সাথে সরাসরি দেখা ও হাত মেলানোর সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী বাগেরহাটের মোংলা বন্দর সফর করেছেন। সফরটি স্থানীয় মানুষের কাছে রাজনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রত্যাশারও প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাদের আশা, প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ জোরদার হবে।
মোংলার ব্যবসায়ী ফিরোজ আহমেদ বলেন, তারেক রহমানের আগমন তাদের অঞ্চলের উন্নয়ন ও মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রত্যাশা বাড়িয়েছে। তার ভাষ্য, চীনের সাথে মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন নিয়ে করা চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে এবং এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরবে।
ব্যবসায়ী হেমায়েত উদ্দিন বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে উন্নত অবকাঠামো অপরিহার্য। তার প্রত্যাশা, নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে মোংলায় বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি এলএনজি টার্মিনাল চালু হলে এ অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়বে।
বিএনপি নেতা হাফিজুর রহমান তুহিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দর জেটি, সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্ট এলাকায় প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল এবং নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্ধারিত স্থান পরিদর্শন করেছেন। তার আশা, এ পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে অসম্পূর্ণ জেটি নির্মাণ, ড্রেজিংসহ আটকে থাকা প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেয়া হবে।
তুহিনের মতে, প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল ও অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জুলফিকর আলী বলেন, মোংলা বন্দরের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ ত্বরান্বিত করবে বলে তারা আশা করছেন। তার মতে, নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও এলএনজি টার্মিনাল নির্মিত হলে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মোংলা বন্দর দিয়ে আমদানি করা রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ব্যবসার সাথে যুক্ত ব্যবসায়ীরাও প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে প্রত্যাশা জানিয়েছেন। রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারকদের সংগঠন বারভিডার সভাপতি আব্দুল হক বলেন, মোংলা বন্দরে রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে আমদানির ক্ষেত্রে তাদের সংগঠন বৈষম্যের শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তারেক রহমানের সফরের মাধ্যমে এ বৈষম্য নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।
বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি শেখ সাহেদ আলী রবি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এ জন্য বন্দর চ্যানেলের নাব্যতা বাড়াতে ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি মোংলা কাস্টমস হাউস ও শুল্ক বিভাগের আধুনিকায়ন প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর সফর এসব উদ্যোগ এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে বলে আশা করেন তিনি।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের ফলে এ অঞ্চলে বিনিয়োগের গতি বাড়বে বলে তিনি আশা করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকার যেসব মানুষ কাজ হারাচ্ছেন, তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতেও উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে ঘিরে মোংলা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা এখন বন্দর সম্প্রসারণ, অবকাঠামোর উন্নয়ন, নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ঘিরে। তবে এসব প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নিতে হলে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর অনুমোদন, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নে কার্যকর অগ্রগতি প্রয়োজন।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)