ডিসি-কমিশনার কার্যালয়ে সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ৫.০৭ মেগাওয়াট
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪০ পিএম
ছবিঃ বাসস
দেশের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়গুলোর ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মোট উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ০৭ মেগাওয়াট। এসব ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করা এবং নেট মিটারিং চালু করা গেলে সরকারি দপ্তরগুলোর বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন কর্মসূচির অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত দেশের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোতে ৪ হাজার ৬৬৩ কিলোওয়াট এবং পাঁচটি বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ৪০৫ দশমিক ৫ কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা স্থাপন করা হয়েছে। এ কর্মসূচিতে সরকারের মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি ১৪ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকারি কার্যালয়গুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হলেও নেট মিটারিংয়ের অনুমোদনসহ কিছু প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। এসব কার্যক্রম শেষ হলে উৎপাদিত বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে। দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে নিজস্ব চাহিদার একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব হলে গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনার পরিমাণও কমবে।
ঢাকা বিভাগের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোর মধ্যে কিশোরগঞ্জে সর্বোচ্চ ৩৬০ কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া মানিকগঞ্জে ৭৭, গোপালগঞ্জে ৭৩, ফরিদপুরে ৫৯, ঢাকা ও রাজবাড়ীতে ৫০ করে, শরীয়তপুরে ২৪ এবং গাজীপুরে ১০ কিলোওয়াট সক্ষমতা রয়েছে। এ বিভাগে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৮৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা।
খুলনা বিভাগের জেলা কার্যালয়গুলোর মধ্যে খুলনায় ১৮০, মেহেরপুরে ৮০, ঝিনাইদহ ও নড়াইলে ৬০ করে এবং বাগেরহাটে ৫০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। এ বিভাগে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৭৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। অন্যদিকে, খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ২০০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ৭৮ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।
রংপুর বিভাগের দিনাজপুরে ১৫১, গাইবান্ধায় ১২২, ঠাকুরগাঁওয়ে ৫০, নীলফামারীতে ৪৮, কুড়িগ্রামে ৪৫, রংপুরে ২৯, পঞ্চগড়ে ২৫ এবং লালমনিরহাটে ২০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। জেলা কার্যালয়গুলোতে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৮ লাখ ৫২ হাজার টাকা। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ৭৭ দশমিক ৫ কিলোওয়াট সক্ষমতা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ৩৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা।
রাজশাহী বিভাগের সিরাজগঞ্জে ১৫০, নওগাঁয় ১০৫, বগুড়ায় ১০০, রাজশাহীতে ৫০, পাবনায় ৪৭ দশমিক ২৬, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩০ করে এবং জয়পুরহাটে ১৩ দশমিক ১২৫ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। এ বিভাগে প্রকল্পের ব্যয় ২ কোটি ৪৮ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ৩৮ কিলোওয়াট সক্ষমতা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ১৮ লাখ ২১ হাজার টাকা।
সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজারে ১৮০, সিলেটে ১০০, সুনামগঞ্জে ৯০ এবং হবিগঞ্জে ১০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। এ বিভাগে জেলা কার্যালয়গুলোর জন্য ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৫৪ লাখ ৮ হাজার টাকা। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ৭০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৭ লাখ ৩৩ হাজার টাকা।
চট্টগ্রাম বিভাগের নোয়াখালীতে ২২৫, কক্সবাজারে ৮৫, চাঁদপুরে ৫০, ফেনীতে ৪৫, বান্দরবানে ৪১ এবং চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ে ৩৯ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এ বিভাগে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ২৮ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।
বরিশাল বিভাগের বরগুনায় ৬০ এবং পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও ঝালকাঠিতে ৫০ কিলোওয়াট করে সক্ষমতার ব্যবস্থা রয়েছে। এ বিভাগে মোট ব্যয় হয়েছে ৪১ লাখ ২১ হাজার টাকা। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ২০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর ও নেত্রকোনায় ১০০ কিলোওয়াট করে, শেরপুরে ৬০ এবং ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ে ৫০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এ বিভাগের প্রকল্প ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ও ব্যয়ের তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় ভাড়া ভবনে পরিচালিত হওয়ায় সেখানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইল, মাদারীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জে দরপত্র আহ্বান করা হলেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা যায়নি। খুলনা বিভাগের চুয়াডাঙ্গায় বরাদ্দের তুলনায় দরপত্রের প্রস্তাবিত মূল্য বেশি হওয়ায় কাজ এগোয়নি। বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠিতে বরাদ্দ থাকলেও অর্থ ব্যয় করা হয়নি। বরিশাল ও ভোলা এবং চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, খাগড়াছড়ি, লক্ষ্মীপুর ও রাঙামাটিতে সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতার তথ্য পাওয়া যায়নি।
সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ক্যাপেক্স মডেলে এসব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। এর ফলে সরকারি কার্যালয়গুলো দিনের বেলায় নিজস্ব চাহিদার একটি অংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ করতে পারছে। নেট মিটারিং চালু হলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে বিল সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হবে। তবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোর নেট মিটারিংয়ের আবেদন এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) শরীয়তপুর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ২৪ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে প্রতি মাসে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৫ হাজার ইউনিট। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালুর পর থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৮০০ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেয়ার প্রয়োজন কমছে এবং বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হচ্ছে। তবে নেট মিটারিংয়ের আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকায় অতিরিক্ত বিদ্যুতের বিপরীতে বিল সমন্বয় এখনো শুরু হয়নি।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বাসসকে বলেন, জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়গুলোর ছাদে স্থাপিত ৫ মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় পর্যায়ে বড় অবদান না রাখলেও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি ভবনে এ ধরনের ব্যবস্থা স্থাপনের দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।
তিনি বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রসারে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ পর্যায়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নেট মিটারিং সংযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও নেট মিটারিং সংযোগের কার্যক্রম সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া জরুরি।
মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় বাসসকে বলেন, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন কর্মসূচির আওতায় মেহেরপুরে ইতোমধ্যে ৮০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। তার মতে, এ ধরনের উদ্যোগ জাতীয় গ্রিডের ওপর বিদ্যুতের চাহিদাজনিত চাপ কমাতে সহায়তা করবে। বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।
সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০’-এ ২০৩০ সালের মধ্যে সাড়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা ১ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ১ হাজার ৬৪২ মেগাওয়াট, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)