Logo
×

Follow Us

জাতীয়

বিএমইউতে মাসে চারটি লিভার প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১১ পিএম

বিএমইউতে মাসে চারটি লিভার প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য

ছবিঃ বাসস

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) লিভার প্রতিস্থাপন কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী বছরের শেষ নাগাদ প্রতি মাসে চারটি লিভার প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে মাসে গড়ে দুটি প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এ সংখ্যা দ্বিগুণ হবে।

বিএমইউর হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়েটিক অ্যান্ড লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সাইফ উদ্দীন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) জানান, লিভার প্রতিস্থাপন এখন নিয়মিত কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে মাসে দুটি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হচ্ছে। আগামী বছরের শেষ নাগাদ প্রতি সপ্তাহে একটি করে, অর্থাৎ মাসে চারটি প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়েটিক অ্যান্ড লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন সার্জারি বিভাগের নেতৃত্বে ১৯টি বিভাগের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত বহুবিভাগীয় দল এসব অস্ত্রোপচার পরিচালনা করে। বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক বিধান সি দাস জানান, লিভার সিরোসিসের শেষ পর্যায়, লিভার ক্যানসার এবং আকস্মিক লিভার বিকল হওয়ার মতো জটিল অবস্থায় প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রোগীদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়।

 দেশে লিভার প্রতিস্থাপনের অগ্রগতি

বাংলাদেশে ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ১৩টি লিভার প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে আটটি বিএমইউতে, তিনটি বারডেম হাসপাতালে এবং দুটি ল্যাবএইড হাসপাতালে করা হয়েছে। ২০১০ সালের ৩ জুন বারডেম হাসপাতালে দেশের প্রথম লিভার প্রতিস্থাপন হয়। এরপর ২০১১ সালের ৬ আগস্ট এবং ২০২০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সেখানে আরও দুটি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।

২০১১ সালের জানুয়ারি ও মে মাসে ল্যাবএইড হাসপাতালে দুটি লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়। বিএমইউর একটি বিশেষজ্ঞ দল অস্ত্রোপচারগুলো পরিচালনা করে। বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০১৯ সালে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অঙ্গ প্রতিস্থাপন কার্যক্রম শুরু করে। এরপর থেকে সেখানে আটটি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যে ছয়টি ২০২৫ ও ২০২৬ সালে নিয়মিত কর্মসূচির আওতায় করা হয়েছে।

সর্বশেষ ছয়টি লিভার প্রতিস্থাপন সরকারি অর্থায়নে বিনা মূল্যে সম্পন্ন হয়েছে। এ কাজে ভারতের হায়দরাবাদের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ দল কারিগরি সহায়তা দিয়েছে। আগামী ৩০ ও ৩১ অক্টোবর বিএমইউতে আরও দুটি লিভার প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

 স্বজনের লিভারে নতুন জীবন

লিভার প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে নতুন জীবন পেয়েছেন বাগেরহাটের শরণখোলার দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইসমাত ইতি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তার লিভার সিরোসিস শনাক্ত হয়। পরে ৪ জুলাই বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে বিনা মূল্যে তার লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়। বড় বোন আয়েশা সিদ্দিকা নিজের লিভারের একটি অংশ দান করেন।

বাসসকে আয়েশা জানান, তিনি ও তার বোন দুজনেই এখন সুস্থ আছেন। অস্ত্রোপচারের পর তিন মাস বিএমইউর নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসা নেয়ার পর সোমবার তারা বাড়ি ফিরেছেন।

এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকার ২৩ বছর বয়সী সুমাইয়া কবির তার ৬২ বছর বয়সী বাবা হাজি কবির হোসেনকে লিভারের একটি অংশ দান করেছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তার বাবার লিভার সিরোসিস শনাক্ত হয়েছিল। চলতি বছরের ৩ জুলাই বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন হয়। সুমাইয়া জানিয়েছেন, তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছেন এবং তার বাবার শারীরিক অবস্থারও উন্নতি হচ্ছে। তবে দুজনকেই নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হচ্ছে।

 প্রতিস্থাপনে সাফল্যের হার ৯০ শতাংশ

বিএমইউর সর্বশেষ ছয়জন লিভার প্রতিস্থাপন গ্রহীতার মধ্যে পাঁচজন বেঁচে আছেন। একজন সংক্রমণের কারণে মারা গেছেন। এর আগের চারজন রোগীও অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ আছেন বলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ জানিয়েছে।

ডা. সাইফ উদ্দীন জানান, বিশ্বের বিশেষায়িত কেন্দ্রগুলোতে লিভার প্রতিস্থাপনের সাফল্যের হার সাধারণত ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ। বিএমইউতে এ হার প্রায় ৯০ শতাংশ। এ ফলাফল কর্মসূচি সম্প্রসারণে উৎসাহ জোগাচ্ছে।

তবে প্রতিস্থাপনের পর রোগীদের আজীবন নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও নির্দিষ্ট ওষুধ সেবন করতে হয়। শরীর যাতে প্রতিস্থাপিত লিভার প্রত্যাখ্যান না করে, সে জন্য এসব ওষুধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকের তথ্য অনুযায়ী, শুরুতে ওষুধের পেছনে মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে তা কমে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকায় নেমে আসতে পারে।

 দেশে প্রতিস্থাপন বাড়লে সাশ্রয় হবে বৈদেশিক মুদ্রা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য উল্লেখ করে হেপাটোলজিস্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ লিভারজনিত রোগে ভুগছেন। এসব রোগে প্রতিবছর ২২ হাজার থেকে ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। সিরোসিস ও লিভার ক্যানসার মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, দেশে প্রতিবছর এক হাজারের বেশি লিভার প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে।

বিদেশে চিকিৎসা নিতে গেলে লিভার প্রতিস্থাপনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। প্রতিবেশী কোনো দেশে এ ধরনের অস্ত্রোপচারের প্যাকেজ খরচ ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা হতে পারে। জটিলতার কারণে দীর্ঘ সময় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) থাকতে হলে ব্যয় এক কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে খরচ এক থেকে দুই কোটি টাকা হতে পারে; পশ্চিমা দেশগুলোতে তা আরো বেশি।

বিএমইউর প্রাথমিক কর্মসূচিতে ১০টি অস্ত্রোপচারের জন্য সরকারি তহবিল থেকে পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। অর্থাৎ প্রতি অস্ত্রোপচারে গড়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল। অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলার পর্যায়ে এই অর্থ ব্যয় হয়। কর্মসূচি নিয়মিত কার্যক্রমে পরিণত হলে ব্যয় আরও কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ভর্তুকির আওতায় বিএমইউতে একটি লিভার প্রতিস্থাপনে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে করপোরেট মূল্যহার অনুযায়ী এ ব্যয় প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা হতে পারে। দেশে এ চিকিৎসার সুযোগ বাড়লে রোগীদের বিদেশমুখিতা কমার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হতে পারে।

 দাতার নিরাপত্তায় বিশেষ গুরুত্ব

বিএমইউতে বর্তমানে জীবিত দাতার লিভারের একটি অংশ নিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশে মৃত ব্যক্তির অঙ্গ থেকে লিভার প্রতিস্থাপন কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। তবে এ বিষয়ে সম্প্রতি আইন পাস হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডা. সাইফ উদ্দীন।

বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, নিকটাত্মীয়রা উপযুক্ত গ্রহীতাকে লিভারের একটি অংশ দান করতে পারেন। সাম্প্রতিক আইনি সংশোধনের আওতায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে আত্মীয় নন, এমন আবেগীয় সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিরও দাতা হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ডা. সাইফ উদ্দীন বলেন, দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্ক সতর্কতার সাথে যাচাই করা হয়, যাতে কোনো আর্থিক লেনদেন বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য না থাকে। দাতা নির্বাচনের আগে বিস্তারিত চিকিৎসা পরীক্ষা করা হয়। সুস্থ ব্যক্তির শরীর থেকে লিভারের অংশ নেওয়ার সময় তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা চিকিৎসকদের দায়িত্ব।

সাধারণত ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী ব্যক্তিদের দাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বিএমইউতে সম্ভব হলে ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্‌রোগের মতো গুরুতর ও অনিয়ন্ত্রিত সমস্যা থাকলে কাউকে দাতা হিসেবে নির্বাচন করা হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়টির তথ্য অনুযায়ী, তাদের কার্যক্রমে এখন পর্যন্ত কোনো দাতার মৃত্যু হয়নি।

একটি লিভার প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচারে সাধারণত ছয় থেকে আট ঘণ্টা সময় লাগে। দাতাকে এক থেকে তিন দিন আইসিইউতে থাকতে হতে পারে এবং শারীরিক অবস্থা ভালো থাকলে প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়া দেয়া হয়। গ্রহীতাকে সাধারণত প্রায় সাত দিন আইসিইউতে এবং মোট দুই থেকে তিন সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হতে পারে।

জীবিত দাতার লিভারের প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত অংশ অপসারণ করা সম্ভব। অবশিষ্ট ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ লিভার সময়ের সঙ্গে পুনরায় বৃদ্ধি পেয়ে কার্যক্ষমতা ফিরে পেতে পারে। লিভার প্রতিস্থাপন কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি দাতা ও গ্রহীতার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

সুত্রঃ বাসস

মন্তব্য করুন