Logo
×

Follow Us

জাতীয়

স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তনের পথ খোলা হবে শহীদদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা: প্রধানমন্ত্রী

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৩ পিএম

স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তনের পথ খোলা হবে শহীদদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা: প্রধানমন্ত্রী

ছবিঃ পিএমও

বিরোধিতার নামে স্বৈরাচারের ফিরে আসার পথ তৈরি করা হলে তা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বিরোধী দলের দায়িত্ব সরকারের সমালোচনা করা হলেও তা হতে হবে গঠনমূলক। শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

সোমবার রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ ও আধুনিকায়ন করা ওসমানী উদ্যানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তারেক রহমান বলেন, জনগণের ভোটে বিএনপি সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, আর অন্য রাজনৈতিক দলগুলো সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে। সরকারি ও বিরোধী দলের দায়িত্ব হলো জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের কল্যাণে আলোচনা, যুক্তিতর্ক ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেয়া। সরকার দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি দলই শুধু জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে কিংবা বিরোধী দল এককভাবে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থে সবাইকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

বিরোধী দলের নেতাদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের সম্মান জানাতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ সবার রয়েছে। জুলাইয়ের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যাঁরা রাজনৈতিক পরিচিতি পেয়েছেন, তাঁদেরও শহীদ ও আহতদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখা উচিত।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তবে কর্মসংস্থান, নাগরিক নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, চিকিৎসাসেবা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারের মতো বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্ন অবস্থান থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্যই জনগণ প্রতিনিধিদের সংসদে পাঠিয়েছেন। সংসদে যুক্তি ও মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ জীবন-জীবিকার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে পারেন।

জুলাইয়ের চেতনা ও শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের আহ্বান

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে গভীর মিল রয়েছে। তাঁরা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করবে, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারবে এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করাও তাঁদের প্রত্যাশার অংশ ছিল।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সহায়তা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সরকার ধাপে ধাপে কাজ করছে বলে জানান তারেক রহমান।

 উন্নয়নে পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব

ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের প্রয়োজন ও দেশের উন্নয়নে অবকাঠামো নির্মাণ জরুরি। তবে উন্নয়নকাজের সময় প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণের পাশাপাশি সবুজ পরিবেশ রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।

সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি হাসপাতাল ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক এলাকা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় সরকারি হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকাগুলোতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে আরও মনোযোগ প্রয়োজন। রোগীদের জন্য পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং চিকিৎসকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসস্থল পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনা ও সরকারি নীতি বাস্তবায়নের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের নিজেদের আচরণেও পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সচেতনতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা উচিত। একটি স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।

জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ও ওসমানী উদ্যানকে জনগণ ও রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি নাগরিকদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন।

 যেভাবে উদ্বোধন হলো জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ

সোমবার সকাল ১০টায় অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান, শহীদ শাহারিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলমকে সাথে নিয়ে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেন তিনি।

উদ্বোধনের পর স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর আধুনিকায়ন করা ওসমানী উদ্যান উদ্বোধন করে বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন। এ সময় উদ্যানসংলগ্ন গ্রন্থাগারও পরিদর্শন করেন তিনি।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটি প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত। ৯০ ফুট উঁচু এ স্মৃতিস্তম্ভে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে ৮৩৪ জন শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে। এর সামনে রয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক।

স্মৃতিস্তম্ভের বাইরের দিকে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে চার ফুট উঁচু এবং ভেতরের দিকে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে সাত ফুট উঁচু রিলিফ ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ভাস্কর্যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

রাজধানীর পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত ২৩ একর আয়তনের ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি পাঁচটি নতুন জলাশয় তৈরি করা হয়েছে। বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণ, নতুন বৃক্ষরোপণ এবং সবুজ দ্বীপ তৈরির উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।

উদ্যানটিতে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, পার্কিং সুবিধা ও জলাশয়ের ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য রাখা হয়েছে ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ব্যবস্থা। দুই স্তরে সাজানো উদ্যানটিতে সড়ক থেকে দুই মিটার উঁচুতে দ্রুত চলাচলের পথও রয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং স্থানীয় সরকার সচিব শহীদুল আলম বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ হাবিব, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য করুন