রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি, লক্ষ্য নভেম্বরের শেষ
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৩ পিএম
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। যন্ত্রাংশের ত্রুটি কাটিয়ে গত ১১ অক্টোবর চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া বা ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ শুরু হয়েছে। এখন জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পরবর্তী ধাপগুলো সম্পন্ন করার কাজ চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সব পরীক্ষা সফলভাবে শেষ করা গেলে নভেম্বরের শেষ নাগাদ প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে। তবে কোনো ধাপে নতুন ত্রুটি দেখা দিলে উৎপাদন শুরুর সময় পিছিয়ে যেতে পারে। এ কারণে নির্দিষ্ট সময়সীমা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এর আগে যন্ত্রাংশের ত্রুটির কারণে প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা পিছিয়ে যায়। গত ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বিএইআরএ) অনুমোদন পাওয়ার পর ১১ অক্টোবর নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে আরো কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করতে হবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম ইউনিটের প্রেশারাইজার সেফটি রিলিফ ভালভের সমস্যার কারণে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন আটকে ছিল। চুল্লির নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই ভালভগুলো অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। চাপ নির্ধারিত নিরাপদ সীমা ছাড়িয়ে গেলে এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে বাষ্প নির্গমনের ব্যবস্থা করে এবং চাপ স্বাভাবিক হলে আবার বন্ধ হয়ে যায়।
গত ২২ সেপ্টেম্বর রাশিয়া থেকে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল রূপপুর প্রকল্পে আসে। তাদের সহায়তায় ত্রুটি শনাক্ত ও সমাধানের কাজ করা হয়। পরে ৩০ সেপ্টেম্বর সেফটি ভালভের উচ্চচাপ পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়। এরপর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন মেলে।
এর আগে প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের পর আগস্টের শেষ অথবা সেপ্টেম্বরের শুরুতে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা ছিল। তবে গত ৩ সেপ্টেম্বর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছিলেন, দুটি ভালভ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ না করায় তখন উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না।
গত ২৮ এপ্রিল প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা শুরু হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষা শেষে ‘বি’ স্টেজ সম্পন্ন হলেও ভালভের সমস্যার কারণে পরবর্তী ‘সি’ স্টেজে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
এদিকে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর বিষয়ে গত ৯ অক্টোবর মস্কোয় রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভের সঙ্গে বৈঠক করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। বৈঠকে প্রকল্পের অগ্রগতি ও প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাব্য সময় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে অ্যালেক্সি লিখাচেভ জানান, ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির প্রথম ইউনিট থেকে দ্রুততম সময়ে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তার প্রত্যাশা, ২০ নভেম্বর থেকে নভেম্বরের শেষ নাগাদ উৎপাদন শুরু করা যাবে।
তবে ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি সম্পন্ন হওয়ার পরও চুল্লির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তা যাচাই এবং ধাপে ধাপে শক্তি বাড়ানোর মতো প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে আরও দুটি নিয়ন্ত্রক অনুমোদন প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। প্রতিটি ধাপের পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার ওপরই উৎপাদন শুরুর সময় নির্ভর করছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, যত দ্রুত সম্ভব বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। যে সমস্যা ছিল, তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে এবং অগ্রগতি ভালো।
আগামী মাসে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের প্রকল্পে নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলা কঠিন। বিভিন্ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এগোতে হয়। তবে যত দ্রুত সম্ভব উৎপাদনে যাওয়ার আশা করছে মন্ত্রণালয়।
রাশিয়ার প্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তায় নির্মিত হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রোসাটমের প্রকৌশল বিভাগ অ্যাটমোস্ট্রয়। কেন্দ্রটিতে ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির দুটি ইউনিট রয়েছে, যার প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী বছর ওই ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক উৎপাদন সফলভাবে সম্পন্ন করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা এখন প্রকল্পটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)