খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে দেশের ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৮ এএম
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)
বাংলাদেশে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। বছরের শুরুর তুলনায় এ সংখ্যা ২৮ লাখ বেশি।
গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে খাদ্যনিরাপত্তার অবনতির পেছনে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, বন্যায় কৃষির ক্ষতি, শিশুদের অপুষ্টি এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাদ্যসহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আজ ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০তম সম্মেলনে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১৯৮১ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্ব খাদ্য দিবস পালিত হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি’। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের মধ্যে দেশে খাদ্যপ্রাপ্তি ও পুষ্টি নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত খাবার ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের অভাবে শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি চার শিশুর একজন খর্বকায়, অর্থাৎ বয়সের তুলনায় তাদের উচ্চতা কম। এ ছাড়া ১১ শতাংশ শিশু ক্ষীণকায়, অর্থাৎ উচ্চতার তুলনায় তাদের ওজন কম। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রতি পাঁচটি পরিবারের মধ্যে দুটি পরিবারে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অণুপুষ্টির ঘাটতি রয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় দেশের প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ২ লাখ ৩০ হাজার কৃষক পরিবার ও প্রায় ১৩ লাখ মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মানুষের জীবিকা।
বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তায় বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিরও প্রভাব রয়েছে। ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। অঞ্চলটিতে অস্থিরতা বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিঘ্ন ঘটলে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর খাদ্য কেনার সক্ষমতাও চাপে পড়তে পারে।
২০২২ সালের শুরুতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে দেশে খাদ্যের দাম বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা বিগত এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল। এরপর কয়েক মাস খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে অবস্থান করে। বর্তমানে এই হার কমলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসেনি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে। তবে মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং আগের তুলনায় দাম বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস। গত ১৩ অক্টোবর সংস্থাটি জানায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া ও মূল্যস্ফীতি বাড়ার সম্ভাবনা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদরও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বাজারে মোটা চালের কেজি কমপক্ষে ৫০ টাকা। খোলা আটার কেজিও একই দামে বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, গত ১ জুলাই থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির আওতায় ৮ লাখ ৩৪ হাজার টন চাল ও গম বিতরণ করা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই পরিমাণ ৪৮ হাজার টন কম। তবে দেশে বর্তমানে প্রায় ২৩ লাখ ৫০ হাজার টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে, যা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে সন্তোষজনক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান মনে করেন, খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে শনাক্ত করে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেয়া। নিম্ন আয়ের পরিবার, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, নারীপ্রধান পরিবার ও দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষের জন্য খাদ্যসহায়তা, ন্যায্যমূল্যে চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি এবং লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তার পরিধি বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
সেলিম রায়হান আরো বলেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও কারসাজি ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারি জোরদার করতে হবে। একই সাথে সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে সাধারণ মানুষ ন্যায্য দামে খাদ্যপণ্য কিনতে পারেন।
সামগ্রিকভাবে, খাদ্যশস্যের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও উচ্চ বাজারদর, কম ক্রয়ক্ষমতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পুষ্টির ঘাটতি দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে কার্যকর সহায়তা পৌঁছানো, বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং পুষ্টিকর খাবারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করাই এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)