শিক্ষার মান যাচাইয়ে বছরভিত্তিক মূল্যায়নের সুপারিশ
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৯ এএম
শিক্ষার মান যাচাইয়ে বছরভিত্তিক মূল্যায়নের সুপারিশ
শুধু পাসের হার নয়, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা যাচাইয়ে বছরভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর সুপারিশ করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষার গুণগত মান পরিমাপ, শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়ন এবং শিক্ষা খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে একগুচ্ছ প্রস্তাব দিয়েছে কমিটি।
গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকের কার্যবিবরণীতে এসব সুপারিশ উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। শিক্ষার বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের কৌশল নির্ধারণ, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বাড়ানো, মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসারেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, শিক্ষার প্রকৃত মান নিশ্চিত করাই কমিটির লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সক্ষমতার তুলনা করতে বছরভিত্তিক মূল্যায়ন ও আধুনিক শিক্ষাক্রম প্রয়োজন। পাশাপাশি তিন বা ছয় মাস অন্তর শিক্ষার্থীদের শিখনফল যাচাইয়ের ব্যবস্থাও চালু করা দরকার। শিক্ষার মানোন্নয়নে পরবর্তী বৈঠকগুলোতে আরো সুপারিশ দেয়া হবে এবং এ বিষয়ে একটি রোডম্যাপ তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হবে।
কমিটির আলোচনায় বলা হয়, কেবল পরীক্ষায় পাসের হার বাড়ানো শিক্ষার সাফল্য নির্ধারণের যথেষ্ট মাপকাঠি নয়। শিক্ষার্থীরা কতটা জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করছে, তা নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিখনফল মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়ার মডেলের আদলে এমন স্থায়ী পরিকল্পনা তৈরির কথা বলা হয়েছে, যাতে সরকার বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তকের মৌলিক কাঠামো বারবার পরিবর্তিত না হয়।
বৈঠকে কমিটির সদস্য রেজা কিবরিয়া গণিত ও বিজ্ঞানে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যাতে পিছিয়ে না পড়ে, সে জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে বছরভিত্তিক মূল্যায়ন চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ধরা হয়েছে, যা আগের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। বৈঠকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুল খালেক এ তথ্য জানান।
শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে ২০২৬ সালে গোল্ডেন জিপিএ অর্জনকারী প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীকে একটি করে ল্যাপটপ দেওয়ার উদ্যোগের কথা কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সাথে নারী শিক্ষার প্রসার এবং ঝরে পড়া রোধে ৭০ লাখ ছাত্রীকে চার হাজার কোটি টাকার বৃত্তির আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বকেয়া পাওনা পরিশোধেও গুরুত্ব দিয়েছে কমিটি। কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ও আইবাস++ পদ্ধতিতে প্রায় ৭০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর পাওনা সরাসরি ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রত্যেককে গড়ে পাঁচ লাখ টাকা করে দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দুই হাজার কোটি টাকার বিশেষ আর্থিক সহায়তার উদ্যোগের জন্য বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে ধন্যবাদ জানানো হয়।
এ ছাড়া এমপিওভুক্তির সব শর্ত পূরণকারী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘদিন বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করা প্রবীণ শিক্ষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এমপিওভুক্তির সুপারিশ করা হয়েছে। কমিটির সদস্য মোছা. তাহসিনা রুশদী ও মো. মুজিবুর রহমান এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক জটিলতা ও ফাইল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে শিক্ষকবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে গবেষণা পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে কমিটি। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরা কোথায় যাচ্ছে, কেন তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়ছে এবং বর্তমানে কী করছে—এসব বিষয় গবেষণার মাধ্যমে চিহ্নিত করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
কারিগরি শিক্ষার প্রসারেও নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিবের (রুটিন দায়িত্ব) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ১৯ দশমিক ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংসদীয় কমিটির সদস্যদের সরাসরি স্কুল-কলেজ পরিদর্শনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। একই সাথে পরবর্তী বৈঠকগুলোতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, সব শিক্ষা বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় দপ্তরের প্রধানদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। হজযাত্রী ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত শিক্ষকদের বকেয়া দ্রুত পরিশোধের জন্য পৃথক তালিকা তৈরি এবং বাজেটের সংস্থান অনুযায়ী বকেয়া ভাতা দেয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার সুপারিশও রয়েছে।
কমিটির সাত দফা সুপারিশের মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে শিক্ষার গুণগত মান পরিমাপের ব্যবস্থা চালু, শিক্ষা খাতের অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন জোরদার, সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রধানদের বৈঠকে উপস্থিতি নিশ্চিত এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের বকেয়া পরিশোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া।
শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখনফল মূল্যায়ন, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষা ব্যবস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন, নির্ধারিত সময়সীমা ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের ওপর উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করবে।
সুত্রঃ বাসস
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)