Logo
×

Follow Us

জাতীয়

প্রিপেইড মিটারে রিচার্জে ০.৫ শতাংশ ছাড়, খরচ নিয়ন্ত্রণে বাড়ছে সুবিধা

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৯ পিএম

প্রিপেইড মিটারে রিচার্জে ০.৫ শতাংশ ছাড়, খরচ নিয়ন্ত্রণে বাড়ছে সুবিধা

সংগৃহীত ছবি

বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার ব্যবহারে গ্রাহকদের উৎসাহিত করতে রিচার্জের অবশিষ্ট অর্থের ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ রিবেট দিচ্ছে সরকার। এ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব ও মিটারের ব্যালেন্স তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী রিচার্জ করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রিপেইড মিটারের মাধ্যমে গ্রাহকরা কতটুকু বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন এবং মিটারে কত টাকা অবশিষ্ট রয়েছে, তা সহজেই জানতে পারেন। এতে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ে এবং মাস শেষে বড় অঙ্কের বিল নিয়ে অনিশ্চয়তা কমে। অন্যদিকে, পোস্টপেইড মিটারে সাধারণত মাস শেষে বিল পাওয়ায় আগেভাগে ব্যয়ের হিসাব রাখা তুলনামূলক কঠিন।

প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থায় গ্রাহক পর্যায়ে সুবিধা বাড়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর কার্যক্রমেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের মতে, এ ব্যবস্থায় অগ্রিম রাজস্ব আদায়, সিস্টেম লস কমানো, ওভারলোড নিয়ন্ত্রণ, লোড ব্যবস্থাপনা এবং বিলিংয়ের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা সহজ হয়। পাশাপাশি মিটার রিডিং নেওয়া, বিল তৈরি ও বিতরণে জনবলের ব্যয় কমে। জরুরি ব্যালেন্স ও ‘ফ্রেন্ডলি আওয়ার’ সুবিধার কারণে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যালেন্স শেষ হলেও গ্রাহক বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ পান।

মোবাইল ব্যাংকিং, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে যেকোনো সময় প্রিপেইড মিটার রিচার্জ করা যায়। এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার ভেন্ডিং স্টেশন, পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) এজেন্ট এবং ব্যাংকের বুথ থেকেও রিচার্জের সুযোগ রয়েছে। ব্যালেন্স কমে এলে মিটারে সতর্কসংকেত পাওয়া যায়। নির্ধারিত ‘ফ্রেন্ডলি আওয়ারে’ ব্যালেন্স শেষ হলেও জরুরি ক্রেডিট সুবিধা ব্যবহার করে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু রাখা সম্ভব।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীরা বলছেন, এ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বিদ্যুৎ খরচের বিষয়ে আগে থেকেই ধারণা পাওয়া। মিটারের ব্যালেন্স পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ফলে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি মাসিক ব্যয় পরিকল্পনা করাও সহজ হয়।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা সালেহ হাসান বাসসকে বলেন, মাসের শুরুতে কত টাকা রিচার্জ করছেন, তার ভিত্তিতে তিনি বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনা করেন। ঘরে বসেই সহজে মিটার রিচার্জ করা যায় এবং অবশিষ্ট ব্যালেন্সও দেখা যায়। এতে প্রয়োজন ছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবহার না করার বিষয়ে সচেতনতা বেড়েছে।

বগুড়া শহরের নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (নেসকো) গ্রাহক মুজাহিদ শেখ জানান, সম্প্রতি তাঁর বাসায় প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে। আগে মাস শেষে কত টাকা বিল আসবে, তা আগে থেকে জানা যেত না। এখন পরিকল্পনা অনুযায়ী রিচার্জ করতে পারছেন এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়ে আরও সচেতন হয়েছেন। তাঁর মতে, প্রিপেইড ও পোস্টপেইড মিটারে বিদ্যুতের মূল খরচ একই হলেও সচেতনভাবে ব্যবহার করলে প্রিপেইড মিটারে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রিপেইড মিটারে বাড়ি বাড়ি গিয়ে রিডিং নেয়া এবং সেই অনুযায়ী বিল তৈরি ও বিতরণের প্রয়োজন হয় না। এতে জনবল ও যাতায়াত ব্যয় সাশ্রয় হয়। অগ্রিম অর্থ পরিশোধের কারণে বিতরণ সংস্থাগুলোর রাজস্ব আদায়ও সহজ হয় এবং বকেয়া বিল আদায়ের জটিলতা কমে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রিপেইড সংযোগ নিতে কোনো নিরাপত্তা জামানত দিতে হয় না। আবাসিক গ্রাহকের অনুমোদিত লোডের প্রতি কিলোওয়াটের জন্য মাসে ৪২ টাকা ডিমান্ড চার্জ এবং ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার সরবরাহ করা মিটারের ক্ষেত্রে সিঙ্গেল ফেজ মিটারের মাসিক ভাড়া ৪০ টাকা এবং থ্রি ফেজ মিটারের ভাড়া ২৫০ টাকা। প্রতি মাসের প্রথম রিচার্জের সময় ভ্যাট, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া সমন্বয় করা হয়। এরপর অবশিষ্ট অর্থের ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ রিবেট যোগ হয়।

উদাহরণ হিসেবে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, দুই কিলোওয়াট অনুমোদিত লোডের একজন আবাসিক গ্রাহক জানুয়ারিতে প্রথমবার এক হাজার টাকা রিচার্জ করলে ভ্যাট, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া বাবদ ১৭১ টাকা ৬২ পয়সা কাটা হবে। এরপর অবশিষ্ট অর্থের ওপর রিবেট যোগ হয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য মিটারে জমা থাকবে ৮৩২ টাকা ৫২ পয়সা।

প্রিপেইড মিটারে আগের মাসের ব্যালেন্স অবশিষ্ট থাকলে নতুন করে রিচার্জ না করেও সেই অর্থ দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। কোনো মাসে রিচার্জ না করলে ওই মাসসহ আগের মাসগুলোর প্রযোজ্য ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া পরবর্তী রিচার্জের সময় সমন্বয় করা হয়।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বাসসকে বলেন, প্রিপেইড মিটার নিয়ে গ্রাহকদের উদ্বেগ ও বিভিন্ন সমস্যা কমাতে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। মিটারের সুবিধা ও ব্যবহারবিধি সম্পর্কে যথাযথ তথ্য পেলে গ্রাহকদের মধ্যে এ ব্যবস্থা নিয়ে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হবে।

তিনি জানান, ডেসকোর অ্যাপে মিটারের অবশিষ্ট ব্যালেন্স ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণসহ বিভিন্ন তথ্য দেখা যায়। এতে গ্রাহকেরা নিজেদের খরচ সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। জরুরি ব্যালেন্সের সুবিধাও রিচার্জের অর্থ শেষ হয়ে গেলে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এড়াতে সহায়তা করে। তার মতে, বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও গণমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে এ ব্যবস্থার সুবিধা সম্পর্কে গ্রাহকদের আরো ভালোভাবে জানাতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) প্রায় ২০ লাখ গ্রাহকের মধ্যে ১২ লাখ প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন। নেসকোর ২৩ লাখের বেশি গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ এ ব্যবস্থার আওতায় এসেছেন।

ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (ডেসকো) ১৪ লাখ ১১ হাজার ৪৩০ জন গ্রাহকের মধ্যে ৯ লাখ ৫৬ হাজার ৩৮১ জন প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) ১৭ লাখ ৫৫ হাজার ৯১৪ জন গ্রাহকের মধ্যে এ মিটার রয়েছে ৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬২৭ জনের।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বাবিউবো) মোট ৪৬ লাখ ৫ হাজার ১৯ জন গ্রাহকের মধ্যে ৩৬ লাখ ৮ হাজার ৩৩১ জন প্রিপেইড মিটারের আওতায় এসেছেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) অধীন প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ গ্রাহকের মধ্যে প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন প্রায় ১৫ লাখ গ্রাহক।

বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, প্রিপেইড মিটার নিয়ে তথ্য বা অভিযোগ জানাতে কেন্দ্রীয় হটলাইন ১৬৯৯৯ চালু রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর নিজস্ব হটলাইন থেকেও গ্রাহকসেবা দেয়া হচ্ছে।

নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান বাসসকে বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে দেশের সব গ্রাহককে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনার কাজ চলছে। নেসকোর ৬০ শতাংশের বেশি গ্রাহকের মিটার ইতোমধ্যে প্রিপেইড ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হয়েছে। শুরুতে কিছু এলাকায় এ ব্যবস্থা নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব থাকলেও বর্তমানে সে ধরনের সমস্যা অনেকটাই কমেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) নূর আহমদ বলেন, প্রিপেইড মিটারে রিবেটসহ বিভিন্ন সুবিধা থাকায় গ্রাহকদের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। বর্তমান ও ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্যক্রমের বিভিন্ন ধাপ কমিয়ে সেবা আরো সহজ ও দক্ষ করা সম্ভব।

সুত্রঃ বাসস

মন্তব্য করুন