Logo
×

Follow Us

জাতীয়

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় সরকার: শামা ওবায়েদ

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৪ এএম

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় সরকার: শামা ওবায়েদ

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করছে সরকার। অতীতে বিএনপি সরকারের সময়ে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবারও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ।

রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শাসনামলে অনুসৃত কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কাজ করছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, অতীতে বিএনপি সরকারের সময়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সাফল্য এসেছিল। নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের সঙ্গে ধারাবাহিক রাজনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সম্পৃক্ততা জরুরি।

১৯৭৮ সালে মিয়ানমার থেকে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের নথি অনুযায়ী, তৎকালীন বার্মার সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তির আওতায় ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তাঁদের প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হয়। শামা ওবায়েদ বলেন, জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ওই সময় বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়েছিল।

এরপর ১৯৯২ সালে নতুন করে প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে তাঁদের মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার জনকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মতে, অতীতের এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরালো হলে প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি সম্ভব।

২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক অনুপ্রবেশের সময় খালেদা জিয়ার মানবিক ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন শামা ওবায়েদ। তিনি জানান, ওই সময় চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থান করলেও সীমান্তে আটকে পড়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দেয়া এবং আশ্রয় দেয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে এই সংকট চলতে থাকায় দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও নিরাপত্তার ওপর চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীও নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। শিবিরগুলোতে প্রতিবছর ৩০ হাজারের বেশি শিশুর জন্ম হচ্ছে বলে জানান শামা ওবায়েদ। একই সাথে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে আসায় খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আশ্রয় ও অন্যান্য মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠছে।

এ পরিস্থিতিতে শুধু মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে সংকট দীর্ঘায়িত করতে চায় না সরকার। বরং প্রত্যাবাসন শুরু করার মতো পরিবেশ তৈরি করাকে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

 রোহিঙ্গা সংকটে জাতিসংঘের জোরালো ভূমিকা চায় ঢাকা

শামা ওবায়েদ বলেন, অতীতের প্রত্যাবাসন উদ্যোগগুলোর সাথে সাম্প্রতিক সময়ের প্রচেষ্টার একটি বড় পার্থক্য হলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা। আগের উদ্যোগগুলোতে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারকে নিয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল আনতে পারেনি।

তার মতে, আগের সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন নিয়ে সমঝোতা করলেও বড় পরিসরে সংগঠিত প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে বর্তমান সরকার জাতিসংঘ, চীন, আসিয়ানভুক্ত দেশ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র এবং অন্যান্য প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক অংশীদারকে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার চেষ্টা করছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে দেশটির কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে বাংলাদেশ। শামা ওবায়েদ জানান, আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ সহজ না হলেও আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় মাধ্যমেই আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ঢাকা।

জাতিসংঘে পাঁচ দফা প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে সরকার। গত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের এক পার্শ্ববৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংকট সমাধানে পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেন।

প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি, বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা বন্ধ, পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি জোরদার এবং আন্তসীমান্ত অপরাধ দমনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি।

এর পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান তাঁদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার মধ্যেই নিহিত। সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে হওয়ায় এর সমাধানও দেশটিকেই নিশ্চিত করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নিউইয়র্ক সফরে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাথেও রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহের সাথে বৈঠকে আরো জোরালো ও সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।

চীন, আসিয়ান ও মুসলিম দেশগুলোর সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। শামা ওবায়েদ বলেন, মিয়ানমারের ওপর চীনের প্রভাব থাকায় প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। ওই আলোচনায় প্রত্যাবাসন এগিয়ে নিতে বেইজিংয়ের সহযোগিতা চাওয়া হয়।

একই সাথে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইনসহ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ। এসব দেশের সাথে মিয়ানমারের সম্পর্ক থাকায় সংকট সমাধানে তারা প্রভাব খাটাতে পারে বলে মনে করছে ঢাকা। তুরস্কসহ অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশও বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগে সহায়তার আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানান শামা ওবায়েদ।

তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং একাধিক কর্তৃপক্ষের উপস্থিতির কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আগের তুলনায় আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে সতর্ক করেন তিনি। তার মতে, এ সংকটের সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। প্রত্যাবাসনের যোগ্য রোহিঙ্গাদের যাচাই ও পরিচয় শনাক্তকরণের কাজ দ্রুত শেষ করতে মিয়ানমারকে বারবার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

শামা ওবায়েদ বলেন, অতীতের সফল প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে। পাশাপাশি জাতিসংঘের আরো সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা চলবে।

সরকারের লক্ষ্য শুধু রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া নয়; বরং তাঁদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন শুরু করার মতো বাস্তব পরিস্থিতি তৈরি করা। এ জন্য মিয়ানমারের সাথে যোগাযোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত চাপ ও সহযোগিতাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে বাংলাদেশ।

মন্তব্য করুন