দেশে আইভি স্যালাইনের সংকট, উৎপাদন কমিয়েছে কোম্পানিগুলো
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৬ এএম
হাম ও ডেঙ্গুর প্রকোপে সারা দেশে হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ার সাথে সাথে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে শিরায় দেয়ার তরল স্যালাইনের। চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে একাধিক বেসরকারি ওষুধ কোম্পানি। উৎপাদন ব্যয়ের সাথে বাজারমূল্যের সামঞ্জস্য না থাকায় লোকসানের কথা জানিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো স্যালাইনের দাম সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছে। ফলে হাসপাতালের রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় স্যালাইন সংগ্রহ করতে এক ফার্মেসি থেকে অন্য ফার্মেসিতে ছুটতে হচ্ছে স্বজনদের।
ফার্মেসি ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, প্রায় ২০ দিন ধরে বিভিন্ন কোম্পানি থেকে নিয়মিত স্যালাইন সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে ডেঙ্গু ও হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ায় চাহিদার চাপ আরো বেড়েছে। রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের মেডিকেয়ার ফার্মেসির কর্মী ফয়সাল আহমেদ জানান, প্রতিদিন অনেক মানুষ তরল স্যালাইন কিনতে এলেও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছেন না তাঁরা। ওরিয়ন, পপুলার ও বেক্সিমকোসহ বিভিন্ন কোম্পানির সোডিয়াম ক্লোরাইড স্যালাইনের সংকট রয়েছে। প্রেসক্রিপশন নিয়ে এসেও অনেককে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সাবেক পরিচালক জাকির হোসেন রনি বলেন, বেসরকারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্যালাইনের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও সরকার নির্ধারিত মূল্য সমন্বয় না করায় লোকসানের মুখে প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছে। অন্যদিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ায় স্যালাইনের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এতে সাধারণ রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
রাজধানীর মালিবাগের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীর স্বজন শাকিল হোসেন জানান, মালিবাগ, মগবাজার ও ইস্কাটন এলাকার প্রায় ৩০টি ফার্মেসি ঘুরেও তিনি এক ব্যাগ স্যালাইন পাননি। শেষ পর্যন্ত শাহবাগের একটি ফার্মেসি থেকে দ্বিগুণ দামে স্যালাইন কিনতে হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, স্বাভাবিক সময়ে প্রতি ব্যাগ স্যালাইন ৮০ থেকে ৮৭ টাকায় বিক্রি হলেও সংকটের কারণে তা সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
চাহিদা ৯০ লাখ, সরকারি উৎপাদন মাত্র ৪ লাখ ব্যাগ
আইভি স্যালাইন প্রস্তুতকারকদের হিসাবে, হামের প্রাদুর্ভাব ও ডেঙ্গুর প্রকোপের আগে দেশে প্রতি মাসে তরল স্যালাইনের চাহিদা ছিল প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ লাখ ব্যাগ। বর্তমানে তা বেড়ে ৮০ থেকে ৯০ লাখ ব্যাগে পৌঁছেছে। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ৩ থেকে ৪ লাখ ব্যাগ। স্বাভাবিক সময়েও দেশে স্যালাইনের মাসিক চাহিদা প্রায় ৫০ লাখ ব্যাগের কাছাকাছি থাকায় সরকারি উৎপাদন দিয়ে বাজারের বড় অংশের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।
চিকিৎসকেরা গুরুতর অসুস্থ রোগীদের শরীরে পানিশূন্যতা প্রতিরোধ এবং তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রয়োজন অনুযায়ী আইভি স্যালাইন দিয়ে থাকেন। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এটি জরুরি হলেও সব রোগীর জন্য শিরায় স্যালাইন দেয়ার প্রয়োজন হয় না। রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্যালাইন ব্যবহার করা হয়।
উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় দাম সমন্বয়ের দাবি
বেসরকারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, ২০১৫ সালের পর থেকে তরল স্যালাইনের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বাড়ানো হয়নি। অথচ আমদানি করা কাঁচামাল, প্যাকেজিং, ডলারের বিনিময়মূল্য, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও শ্রমিকদের বেতনসহ উৎপাদনের বিভিন্ন খরচ বেড়েছে। কোম্পানিগুলোর হিসাবে, সরকার নির্ধারিত ৮৭ টাকার বিপরীতে বর্তমানে প্রতি ব্যাগ স্যালাইন উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১২০ টাকা।
ওরিয়ন ইনফিউশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল বাশার বলেন, স্যালাইনের মূল্য সংশোধনের প্রস্তাব প্রায় তিন মাস ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আটকে রয়েছে। আগে তাঁদের প্রতিষ্ঠান প্রতি মাসে ১০ লাখ ব্যাগ স্যালাইন উৎপাদন করলেও বর্তমানে তা কমিয়ে ৪ থেকে ৫ লাখ ব্যাগে নামানো হয়েছে। তিনি জানান, পানি ছাড়া আইভি স্যালাইনের অন্যান্য উপাদানের জন্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ২০১৫ সালের মূল্যতালিকা অনুযায়ী স্যালাইন বিক্রি করতে হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসানে পড়ছে।
দেশে প্রায় ২৫০টি ওষুধ কোম্পানি থাকলেও আইভি স্যালাইন উৎপাদনে যুক্ত প্রতিষ্ঠান মাত্র ছয়টি বলে জানান খায়রুল বাশার। সংশ্লিষ্টদের মতে, সীমিতসংখ্যক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা এবং মূল্য সমন্বয়ে দীর্ঘসূত্রতা—দুইয়ের প্রভাবেই বর্তমান সংকট আরো প্রকট হয়েছে।
উৎপাদন বন্ধ একাধিক প্রতিষ্ঠানের
চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন ব্যয়ের সাথে বিক্রয়মূল্যের সামঞ্জস্য না থাকায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ বা কমিয়ে দিয়েছে। একসময় দেশের অন্যতম বৃহৎ স্যালাইন উৎপাদনকারী লিবরা ইনফিউশনসের কারখানা বন্ধ রয়েছে। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস স্যালাইন উৎপাদন স্থগিত রেখেছে এবং বেক্সিমকো কিছু উৎপাদন বন্ধ করেছে। এ ছাড়া অপসোনিন, ওএসএল ফার্মা, এসেনশিয়াল ড্রাগস ও পপুলার ফার্মাও উৎপাদন কমিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত মূল্য সমন্বয় ও উৎপাদন বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ না নিলে হাসপাতালগুলোতে স্যালাইনের সরবরাহ পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। বিশেষ করে ডেঙ্গু ও হামের প্রকোপের মধ্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট রোগীদের চিকিৎসায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
স্যালাইন উৎপাদন পুনরায় চালুর পরিকল্পনা আইপিএইচের
সরকারিভাবে স্যালাইন উৎপাদনের জন্য রাজধানীর মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে (আইপিএইচ) আগে দৈনিক গড়ে ৮ হাজার ব্যাগ তরল স্যালাইন তৈরি করা হতো। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে না পারায় ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। একই সাথে আইপিএইচের ছয়টি আঞ্চলিক কেন্দ্রেও স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
আইপিএইচের পরিচালক ডা. সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী জানান, পুরোনো অবকাঠামো সংস্কার করে পুনরায় তরল স্যালাইন উৎপাদন শুরু করার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য ইতোমধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করা হয়েছে। সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাবে অনুমোদন দিলে এক বছরের মধ্যে উৎপাদনে ফেরা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্য সমন্বয়ের দাবি পর্যালোচনা এবং নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে স্যালাইনের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় অগ্রগতি হতে পারে। একই সাথে রোগীদের জরুরি চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় এই উপকরণের বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)