Logo
×

Follow Us

জাতীয়

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে কঠোর ব্যবস্থা চান রাষ্ট্রপতি

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে কঠোর ব্যবস্থা চান রাষ্ট্রপতি

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সাথে কন্যাশিশুর নিরাপত্তা, সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে দ্রুত তদন্ত, কার্যকর বিচার এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

সোমবার (১২ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং ন্যাশনাল গার্ল চাইল্ড অ্যাডভোকেসি ফোরাম (এনজিসিএএফ) যৌথভাবে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, অনলাইন জগৎ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সর্বত্র কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে অপরাধের দ্রুত তদন্ত, কার্যকর বিচার এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের বিকল্প নেই।

কন্যাশিশুর কল্যাণ নিশ্চিত করতে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ছেলে ও মেয়েকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে এবং উভয়ের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। শিক্ষা, চিকিৎসা, খেলাধুলা, প্রযুক্তি, গণমাধ্যম, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা যোগ্যতা ও সাফল্যের পরিচয় দিচ্ছেন। বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের আন্তর্জাতিক অর্জন এবং নিশাত মজুমদারের এভারেস্ট জয়ের মতো সাফল্য দেশের জন্য গর্বের বিষয়।

অভিভাবকদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, কন্যাশিশুকে বোঝা নয়, সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে হবে। ছেলে ও মেয়েকে সমান মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা দিতে হবে। মেয়েদের বিয়ের জন্য সঞ্চয়ের চেয়ে তাদের শিক্ষা, বিকাশ ও কল্যাণে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, কন্যাশিশুর জন্ম কোনো বোঝা নয়, বরং অফুরন্ত সম্ভাবনার সূচনা। তার শিক্ষা মৌলিক অধিকার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দুই কন্যার পিতা হিসেবে প্রতিটি কন্যাশিশুর মধ্যে নিজের সন্তানের প্রতিচ্ছবি দেখতে পান উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা তার কাছে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের পাশাপাশি গভীর মমতার বিষয়।

নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, সব ধর্মের নৈতিক শিক্ষায় নারী ও কন্যাশিশুর মর্যাদা রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু সমাজের অনেক ক্ষেত্রে কন্যাসন্তানকে অবহেলা ও অবমূল্যায়নের শিকার হতে হয়। এ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

এ বছরের আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসের প্রতিপাদ্য ‘শিশু বিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়’ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, বাল্যবিয়ে কেবল একটি শিশুর শৈশব কেড়ে নেয় না, তার শিক্ষাজীবন ব্যাহত করে এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও সীমিত করে। এর ফলে অকাল মাতৃত্ব, স্বাস্থ্যঝুঁকি, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা ও সহিংসতার আশঙ্কা বাড়তে পারে। তাই কন্যাশিশুর নির্যাতন ও নিপীড়ন প্রতিরোধে সমাজের সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

কিশোরীদের জন্য প্রতিটি উপজেলায় উপযোগী স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। পাশাপাশি জরুরি সহায়তা পাওয়ার বিভিন্ন হেল্পলাইন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

কন্যাশিশুদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে, শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। অন্যায়, নির্যাতন কিংবা নিপীড়নের শিকার হলে বিশ্বস্ত অভিভাবক, শিক্ষক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে মার্শাল আর্ট শেখার প্রতিও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, কন্যাশিশুর সাফল্যের সাথে পরিবার, সমাজ ও দেশের ভবিষ্যৎ জড়িত।

রাষ্ট্রপতি আরো বলেন, কন্যাশিশুর বিশ্বজয়ের পথ তৈরি করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং সর্বোপরি মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নারী ও কন্যাশিশুকে পিছিয়ে রেখে কোনো সমাজ বা জাতির পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই প্রতিটি কন্যাশিশু যেন নিরাপদে জন্ম নেয়, নির্ভয়ে বেড়ে ওঠে, শিক্ষার সুযোগ পায়, দক্ষতা অর্জন করে এবং আত্মনির্ভরশীল হতে পারে—এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

নারীশিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকার কথাও স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, নারীদের শিক্ষাবৃত্তি ও বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ সৃষ্টিতে খালেদা জিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। নারীর নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য সেলিমা রহমান। এ ছাড়া বক্তব্য দেন দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর প্রশান্ত ত্রিপুরা, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রওশন আরা বেগম এবং এনজিসিএএফের সহসভাপতি শাহীন আক্তার ডলি।

এর আগে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শায়লা শারমিন জামান স্বাগত বক্তব্য দেন। পরে অনুষ্ঠানে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয় এবং দুই কন্যাশিশু নিজেদের মতামত তুলে ধরে।

মন্তব্য করুন