Logo
×

Follow Us

জাতীয়

সৌরবিদ্যুতে ইউনিট প্রতি সাশ্রয় ৫-৬ টাকা, মিলবে পরিবেশগত সুফল

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৭ এএম

সৌরবিদ্যুতে ইউনিট প্রতি সাশ্রয় ৫-৬ টাকা, মিলবে পরিবেশগত সুফল

সংগৃহীত ছবি

দেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে একদিকে বিদ্যুৎ বিল কমবে, অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস পাবে। গ্রিডের বিদ্যুতের তুলনায় ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে প্রতি ইউনিটে ৫ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। একই সাথে নবায়নযোগ্য এই জ্বালানি পরিবেশ সুরক্ষা ও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৮৭১ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ১ হাজার ৫৭৮ দশমিক ৪১৫ মেগাওয়াট। এই সক্ষমতার মধ্যে ১ হাজার ২০০ দশমিক ৯৪ মেগাওয়াট গ্রিড-সংযুক্ত এবং ৩৭৭ দশমিক ৪৭ মেগাওয়াট গ্রিডের বাইরে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বাসসকে বলেন, ব্যক্তি পর্যায়ে চাহিদা অনুযায়ী সৌর প্যানেল স্থাপন করা গেলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ৫ থেকে ৬ টাকা সাশ্রয় সম্ভব। এতে বিদ্যুৎ বিল কমার পাশাপাশি সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপও হ্রাস পেতে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবারে বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি, তারা এ ব্যবস্থার মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে।

তিনি জানান, দিনের বেলায় শিল্পকারখানাগুলোকে গ্রিডের বিদ্যুতের জন্য প্রতি ইউনিটে ১১ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে ১৬ টাকা ৬ পয়সা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়। বিপরীতে, ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৫ থেকে ৬ টাকা সাশ্রয় হতে পারে।

শফিকুল আলমের হিসাবে, ছাদে স্থাপিত সৌর প্যানেল থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয় ৪ থেকে ৫ টাকা। তবে ভূমিতে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রে এ ব্যয় ৮ থেকে ৯ টাকা। সরকার জমি, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধা দিলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় ব্যয় প্রায় ৬ টাকা ৫০ পয়সায় নামিয়ে আনা সম্ভব। এসব সুবিধা না থাকলে ব্যয় বেড়ে প্রায় ৯ টাকা হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার বড় সুবিধা হলো উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা যায়। এতে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনার প্রয়োজন কমে। তবে স্থাপনের প্রাথমিক ব্যয়, অর্থায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী প্রকৃত সাশ্রয়ের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে ব্যয় হয় ১৩ টাকা ১৩ পয়সা। ফার্নেস অয়েল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এই ব্যয় ২৭ টাকা ৪০ পয়সা। অন্যদিকে, দেশীয় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে ব্যয় প্রায় ৭ টাকা ৯ পয়সা।

সৌরবিদ্যুতের কার্যকারিতার একটি উদাহরণ পাওয়া যায় শেরপুরের নকলা উপজেলার হুজুরীকান্দা গ্রামের মতি অ্যাগ্রিভোলটাইক প্রকল্পে। প্রকল্পটির পরিচালক শহিদুল ইসলাম বাসসকে জানান, নিরাপদ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, সেচপাম্প ও কার্যালয়ের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে সেখানে মোট ৩৫ দশমিক ৩ কিলোওয়াট ক্ষমতার দুটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের জন্য ২৬ দশমিক ৫ কিলোওয়াট এবং সেচপাম্প ও কার্যালয়ের জন্য ৮ দশমিক ৮ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থা থেকে প্রতিদিন গড়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ স্থাপিত সক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ। ফলে প্রকল্প এলাকায় লোডশেডিংয়ের সমস্যা হয় না বলে জানান তিনি।

শহিদুল ইসলাম বলেন, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে মোট ব্যয় হয়েছে ৩০ লাখ টাকা এবং এর আনুমানিক আয়ুষ্কাল ২৫ বছর। রক্ষণাবেক্ষণ ও খুচরা যন্ত্রাংশের খরচ বাদ দিলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৩ টাকা। ভারত ও পাকিস্তানে এ ব্যয় প্রতি ইউনিটে সাড়ে ৩ থেকে ৪ টাকার মধ্যে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের পাশাপাশি প্রায় নয় ঘণ্টার বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমপরিমাণ সংরক্ষণক্ষমতা রাখা হলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজে ব্যবহার করে ২০ বছরে প্রতি ইউনিটের আনুমানিক ব্যয় ৭ টাকা ৪৩ পয়সায় নামিয়ে আনা সম্ভব।

সৌরবিদ্যুতের প্রসার বাড়াতে সরকার সম্প্রতি নির্দিষ্ট কিছু সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এ সুবিধা ১৮০ দিনের জন্য কার্যকর থাকবে। পাশাপাশি ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে উৎসাহ দিতে প্রণোদনা চালু করা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে প্রতি ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ হাসান মেহেদী বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোলিয়াম সরবরাহ ব্যাহত হলে আমদানিনির্ভর দেশগুলো জ্বালানি সংকটে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে। এ জন্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সরকারের আরো কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল মেয়াদি জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলে ২০৩০ সালের মধ্যে ভূমিতে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে ২০২৮ সালের মধ্যে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা ৯ টাকা ১২ পয়সা দরে ৯১৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ১২টি স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের (আইপিপি) সঙ্গে চুক্তি করেছে বিপিডিবি। এ ছাড়া নিজস্ব অর্থায়নে গ্রিড-সংযুক্ত ৬৮৯ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার বিভিন্ন প্রকল্প নেয়া হয়েছে, যেগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।

নতুন বাণিজ্যিক, শিল্প ও সরকারি ভবনে ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের শর্তও বাস্তবায়ন করছে সরকার। বিশেষ করে ১০ কিলোওয়াটের বেশি বৈদ্যুতিক লোড রয়েছে—এমন স্থাপনায় সৌর প্যানেল স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে স্বল্পসুদে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং শহরের আবাসিক গ্রাহকদের জন্য সহজ অর্থায়ন সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সৌর, বায়ু ও বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোকে জ্বালানি খাতের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও উৎস বৈচিত্র্যকরণের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ, পরিবেশদূষণ কমানো এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনেও ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে সৌরবিদ্যুতে প্রতি ইউনিটে ৫ থেকে ৬ টাকা সাশ্রয়ের হিসাব নির্ভর করবে বিদ্যুতের প্রচলিত ট্যারিফ, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের প্রাথমিক বিনিয়োগ, ব্যাটারি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং ব্যবহারের ধরনের ওপর। তাই দীর্ঘমেয়াদি সাশ্রয় নির্ধারণে এসব খরচ বিবেচনায় নেয়া জরুরি।

মন্তব্য করুন