রূপপুরে ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে বাংলাদেশ
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৪ এএম
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে। প্রথম ইউনিটের নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষার ফল অনুমোদিত হওয়ায় পরবর্তী ধাপের কমিশনিং কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন হলে আগামী মাসে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। উভয় ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস বহুমুখী হওয়ার পাশাপাশি গ্যাস, তেল ও কয়লানির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা ছিল গত সেপ্টেম্বরে। তবে নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি শনাক্ত হওয়ায় কার্যক্রম পিছিয়ে যায়। পরে উচ্চ চাপে দুই দফা পরীক্ষা সম্পন্ন করে ফলাফল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার পরীক্ষার ফল অনুমোদন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পরীক্ষায় নিয়ন্ত্রণ ভালভগুলো নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী কাজ করছে কি না, তা যাচাই করা হয়। পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা ও তেজস্ক্রিয়তাসংক্রান্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাও পরীক্ষা করা হয়েছে। এই অনুমোদনের ফলে চুল্লির পরবর্তী পর্যায়ের কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
প্রথম ইউনিট চালুর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ পর্যায়ে চুল্লির ভেতরে নিয়ন্ত্রিত ও স্বনির্ভর পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু হয়। এরপর বিভিন্ন কারিগরি পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চুল্লির কার্যক্রম যাচাই করা হবে। পর্যায়ক্রমে তাপ উৎপাদন বাড়ানো, টারবাইন চালু এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পরীক্ষামূলক উৎপাদন থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে আরো সময় প্রয়োজন হবে।
রাশিয়ার কারিগরি সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত হচ্ছে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি। প্রকল্পটির পরিকল্পিত পরিচালনকাল ৬০ বছর। প্রয়োজনীয় সংস্কার, নিরাপত্তা মূল্যায়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে এ মেয়াদ আরো ২০ থেকে ৩০ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি পরিবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট সময় পরপর প্রতিটি ইউনিট বন্ধ রাখতে হবে। সাধারণ পরিচালন পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় দেড় বছর পর নতুন পারমাণবিক জ্বালানি দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা স্বাধীনতার পরপরই আলোচনায় আসে। বিভিন্ন সময়ে সম্ভাব্যতা যাচাই ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উদ্যোগ নেয়া হলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লেগেছে। ১৯৭৭ সালে ফরাসি প্রতিষ্ঠান সফরাটমের মাধ্যমে ১২৫ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়। তবে সে সময় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সমীক্ষা ও প্রস্তুতিমূলক কাজের মাধ্যমে প্রকল্পটি এগিয়ে নেয়া হয়। ১৯৯৬ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০০৫ সালে চীনের সাথে সহযোগিতা চুক্তি এবং ২০০৭ সালে দুটি ৫০০ মেগাওয়াটের ইউনিট স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। পরে রাশিয়ার সাথে সহযোগিতার ভিত্তিতে বর্তমান প্রকল্পের কাঠামো নির্ধারিত হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রটি কমিশনিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করে।
দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা বিভিন্ন সরকারের সময়েই এগিয়েছে। বিএনপির ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রতিশ্রুতি ছিল। দলটির ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার অব্যাহত রাখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্মার্ট গ্রিড সম্প্রসারণ, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যের কথাও রয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পারমাণবিক শক্তি উইংয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প নয়; এটি দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নেরও বড় সুযোগ। প্রথম ইউনিট উৎপাদনের প্রস্তুতির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের ইউরেনিয়ামও প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
একই উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব বলেন, রূপপুর কেন্দ্র চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ খাতের পাশাপাশি অর্থনীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বাসসকে বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে সহায়তা করবে। পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে অর্জিত সক্ষমতা কাজে লাগাতে নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রোসাটম কাজ করছে। প্রকল্পের অগ্রগতি ও সমন্বয়ের পাশাপাশি পারমাণবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দায়িত্ব পালন করছে।
রূপপুর কেন্দ্রের দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় সংযোজন হবে। তবে এ সম্ভাবনার বাস্তব সুফল নির্ভর করবে নিরাপত্তা যাচাই, কমিশনিংয়ের প্রতিটি ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করা, নিরবচ্ছিন্ন পরিচালনা এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতার ওপর।
সুত্রঃ বাসস
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)