Logo
×

Follow Us

জাতীয়

সারাদেশে ২০ হাজার কৃষি উদ্যোক্তা গড়বে সরকার

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম

সারাদেশে ২০ হাজার কৃষি উদ্যোক্তা গড়বে সরকার

এ কর্মসূচিতে ৬০ শতাংশ নারী ও ৪০ শতাংশ পুরুষকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে

কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানি বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সারাদেশে ২০ হাজার কৃষি উদ্যোক্তা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ কর্মসূচিতে ৬০ শতাংশ নারী ও ৪০ শতাংশ পুরুষকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষি খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তরুণদের আয়বর্ধক কাজে যুক্ত করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের (ডিএএম) আওতায় বাস্তবায়নাধীন ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ (পার্টনার) প্রকল্পের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। দেশের ৬৪ জেলার ২০৮টি উপজেলায় ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় কৃষি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বীজ উৎপাদন, নার্সারি, মাশরুম, ভার্মিকম্পোস্ট, পাটজাত ও দুগ্ধজাত পণ্যসহ বিভিন্ন উপখাতে উদ্যোক্তা তৈরির কাজ চলছে। পাশাপাশি আলু, আম, কাঁঠাল, টমেটো ও সুগন্ধি চাল—এই পাঁচটি কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ ও রপ্তানি পর্যন্ত কার্যক্রম জোরদার করতে ভ্যালুচেইনভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলা হচ্ছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব সংগঠনের নীতিমালা ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেয়েছে।

প্রশিক্ষণের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের হাতে-কলমে কাজ শেখানো, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং ব্যবসা পরিচালনায় সহায়তা দেয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষিত উদ্যোক্তাদের জন্য ম্যাচিং গ্রান্টের আওতায় বাড়িতে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হবে। এসব যন্ত্রপাতি কেনার ব্যয়ের ৭০ শতাংশ প্রকল্প থেকে ভর্তুকি হিসেবে দেয়া হবে। বাকি ৩০ শতাংশ বহন করবেন উদ্যোক্তারা।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পার্টনার-ডিএএম অঙ্গের এজেন্সি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ড. মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফারুক রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে জানান, এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৮৭৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। চলতি বছরে আরও প্রায় ৭ হাজার উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেয়ার লক্ষ্য রয়েছে। দেশের ৬৪ জেলা ও ২০৮টি উপজেলায় এ কার্যক্রম চলছে।

তিনি বলেন, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শুধু উদ্যোক্তা তৈরি নয়, তাঁদের ব্যবসায়িক দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা জ্ঞান ও বাজারের সাথে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষে উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধা চিহ্নিত করে তা দূর করতে ইনকিউবেশন সহায়তা দেয়া হচ্ছে।

কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে ডিএএমের উদ্যোগে বিভিন্ন কৃষিপ্রধান এলাকায় ইতোমধ্যে ৭৬৭টি মার্কেট অ্যাক্টরস বিজনেস স্কুল গড়ে তোলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নির্দিষ্ট এলাকার প্রধান কৃষিপণ্যকে কেন্দ্র করে এসব স্কুল পরিচালিত হচ্ছে। আলুর জন্য ইতোমধ্যে ২২৭টি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। চলতি বছর আরো ৩৩৫টি স্কুল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

এসব স্কুলের মাধ্যমে কৃষক, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, হিমাগার মালিক, পরিবহনকর্মীসহ বাজারের বিভিন্ন অংশীজনকে একই কাঠামোর আওতায় আনা হচ্ছে। এতে কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থার সমস্যা ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করা এবং উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত সমন্বয় বাড়ানো সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

পার্টনার প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর আবুল কালাম আজাদ বাসসকে বলেন, উদ্যোক্তারা নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থান ও আত্মনির্ভরশীলতার সুযোগ তৈরি করতে পারেন। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখতে উদ্যোক্তাদের নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করা এবং সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি। তাঁর মতে, এ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষিকে আধুনিক ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।

এ উদ্যোগের সুফল পাচ্ছেন প্রশিক্ষণ নেয়া তরুণ উদ্যোক্তারাও। তাঁদের একজন গাজীপুরের তামিমা আক্তার ন্যান্সি। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ১২ দিনের প্রশিক্ষণে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের পর তিনি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে আরো মনোযোগী হন। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে ব্যবসা শুরু করা ন্যান্সি জ্যাম, জেলি, আচার, কাঁঠাল ও মাছের চিপস তৈরি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছেন।

শুরুর দিকে পণ্য উৎপাদন, নির্বাচন ও সংরক্ষণে নানা সমস্যার মুখোমুখি হলেও প্রশিক্ষণের পর তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে। গাজীপুর কৃষি বিপণন কর্মকর্তার সহযোগিতায় তিনি ট্রেড লাইসেন্স, স্বাস্থ্য সনদসহ প্রয়োজনীয় অনুমোদন সংগ্রহ করেন। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠিত ‘ন্যান্সি অ্যাগ্রো অ্যান্ড ফুড’-এ চারজন কাজ করছেন।

কৃষি খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় বাড়ানোর বড় সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের কৃষিতে। তবে আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, বাস্তবমুখী পরিকল্পনার ঘাটতি এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সীমাবদ্ধতা এ খাতের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাঁদের মতে, প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা গেলে কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা উন্নয়ন দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

মন্তব্য করুন