বাংলাদেশের পোস্টাল ভোটিং মডেলে আগ্রহ নেপাল-শ্রীলঙ্কার
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৪ এএম
ছবিঃ বাসস
বাংলাদেশের প্রযুক্তিনির্ভর পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে নেপাল ও শ্রীলঙ্কা। প্রবাসী ও দেশের অভ্যন্তরে নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে তৈরি বাংলাদেশের ‘আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিং সিস্টেম’ দক্ষিণ এশিয়ার দেশ দুটির নজর কেড়েছে। এ ব্যবস্থার কারিগরি দিক ও বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজেদের নির্বাচনে পোস্টাল ভোটিং চালুর সম্ভাবনা যাচাই করছে তারা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশি এবং দেশের ভেতরে নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পোস্টাল ভোটের আওতায় আনে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা নিতে নেপালের নির্বাচন কমিশনের ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করছে। গত সেপ্টেম্বরে শ্রীলঙ্কা সফরেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহের বিষয়টি উঠে আসে।
ইসির ‘আউট অব কান্ট্রি ভোটিং সিস্টেম অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন’ (ওসিভি-এসডিআই) প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান বাসসকে বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা বিশ্বপরিসরে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নেপালের প্রতিনিধিদল নিজ উদ্যোগে এ ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে এসেছে এবং তারা ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। শ্রীলঙ্কার পক্ষ থেকেও আগ্রহ পাওয়া গেছে। দেশের প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমাদৃত হওয়া গর্বের বিষয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সালীম আহমাদ খান আরো বলেন, জাতীয় নির্বাচন ও উপনির্বাচনে পাওয়া অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ব্যবস্থাটির বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। তার মতে, পোস্টাল ভোটিংয়ের এই অভিজ্ঞতা নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, যা ভবিষ্যতে আরো কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।
প্রবাসীদের ভোট নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা নিতে চায় নেপাল
বাংলাদেশের পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে আসা নেপালের নির্বাচন কমিশনার ড. রাজিব সুব্বা বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাস্তবতায় বাংলাদেশের এই মডেল কার্যকর সম্ভাবনা দেখিয়েছে। বাংলাদেশ ও নেপালের মতো দেশ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যবস্থায় অগ্রগতি আনতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কারিগরি সহযোগিতা পেলে নেপাল উপকৃত হবে।
নেপালের আগামী প্রাদেশিক নির্বাচনে প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ভোটিং চালুর পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো নেপালেরও বিপুলসংখ্যক নাগরিক বিদেশে কাজ করেন এবং রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে নেপাল।
ড. রাজিব সুব্বার মতে, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করায় নেপাল সম্ভাব্য ভুলগুলো এড়িয়ে তুলনামূলক দ্রুত প্রস্তুতি নিতে পারবে। তবে বাংলাদেশের মডেলটি সরাসরি অনুসরণ করা হবে কি না, তা গবেষণা এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল ও সরকারি কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার পর নির্ধারণ করা হবে।
নেপালের নির্বাচন কমিশনার জানান, আগামী দেড় বছরের মধ্যে দেশটির কোনো একটি প্রাদেশিক নির্বাচনে পোস্টাল ভোটিং চালুর লক্ষ্য রয়েছে। এ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের সাথে এটি তাদের তৃতীয় দফার আলোচনা। প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া সরাসরি পর্যবেক্ষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনই সফরের প্রধান উদ্দেশ্য।
সাইবার নিরাপত্তা ও ভোটার সচেতনতায় গুরুত্ব
নেপালের পরিকল্পনায় প্রবাসী ভোটারদের প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তোলার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত নেপালি শ্রমিকদের মধ্যে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়াতে ভোটার শিক্ষার ওপর জোর দেয়ার কথা জানিয়েছেন ড. রাজিব সুব্বা।
পাশাপাশি ডাকযোগে ব্যালট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানোর ক্ষেত্রে বিলম্ব, কাঠমান্ডুতে সেগুলো পৌঁছানোর সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখছে নেপাল। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রযুক্তি ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে নেপালের নির্বাচন কমিশনার বলেন, এর সফটওয়্যার, কোড ও নিয়ন্ত্রণ নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় রয়েছে। ফলে প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ব্যবস্থা আরো উন্নত হয়ে সম্পূর্ণ অনলাইন ভোটিংয়ের দিকে এগোতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ইসির সাথে নেপালের প্রতিনিধিদলের বৈঠক
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বুধবার নেপালের ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন, নির্বাচন কমিশনার এবং ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় করে। বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহর নেতৃত্বে ইসির কর্মকর্তাদের সাথে পোস্টাল ভোটিংয়ের পরিচালনাগত ও কারিগরি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রতিনিধিদলে নেপালের নির্বাচন কমিশনার ড. জানকী কুমারী তুলাধর, সচিব কৃষ্ণ প্রসাদ কাপরী, সিনিয়র কম্পিউটার অফিসার অনুপ নৌপানে, ডেপুটি অ্যাটর্নি কমলা কাফলে এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রতিনিধি প্রভাত কুমার রয়েছেন।
পোস্টাল ভোটিংয়ে ৮০ শতাংশের বেশি ভোটদান
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধিত ১৫ লাখ ২৮ হাজার ১৩১ জন অনুমোদিত ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১২ লাখ ২৪ হাজার ১৮৮ জন। ভোটদানের হার ছিল ৮০ দশমিক ১১ শতাংশ।
রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছেছে ১১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৯২টি ভোট, যা অনুমোদিত ভোটারের ৭৬ দশমিক ২৮ শতাংশ। এর মধ্যে বৈধ ভোট ছিল ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৪৯৭টি, অর্থাৎ মোট অনুমোদিত ভোটারের ৭০ দশমিক ২৫ শতাংশ।
ইসির তথ্যমতে, প্রবাসী ভোটারদের পাঠানো ৪ লাখ ৯৮ হাজার ২৬৬টি ব্যালটের মধ্যে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ২০৫টি রিটার্নিং কর্মকর্তারা গ্রহণ করেন। অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানরত ভোটারদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হয় ৬ লাখ ৬৭ হাজার ৩৮৮টি ভোট।
প্রবাসী ও দেশের অভ্যন্তরে থাকা ভোটারদের অংশগ্রহণে পোস্টাল ভোটিংয়ের এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের পাশাপাশি অন্য দেশগুলোর জন্যও সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। নেপাল ও শ্রীলঙ্কার আগ্রহের ফলে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রযুক্তিনির্ভর ভোটিং ব্যবস্থা আঞ্চলিক পর্যায়ে বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)