Logo
×

Follow Us

জাতীয়

আসছে মডেল খাল কর্মসূচি: ২০ খালে ২,৪০০ পরিবারের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৭ এএম

আসছে মডেল খাল কর্মসূচি:  ২০ খালে ২,৪০০ পরিবারের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা

ছবিঃ বাসস

দেশের আট বিভাগের ২০টি সরকারি খালকে বহুমুখী ব্যবহারের আওতায় আনতে পরীক্ষামূলকভাবে ‘মডেল খাল’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। খাল পুনঃখননের পর পানি নিষ্কাশনের পাশাপাশি মাছ ও হাঁস পালন, সামাজিক বনায়ন, মৌসুমি সবজি চাষ এবং অতিদরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে এসব জলসম্পদকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ অতিদরিদ্র পরিবারকে সম্পৃক্ত করা হবে। আগামী ১৯ নভেম্বর লালমনিরহাটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্মসূচিটির উদ্বোধন করবেন বলে ধারণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শুরু করা খাল খনন কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় সরকার খাল পুনঃখননের পাশাপাশি সেগুলোর বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে চায়। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, চারটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ চলছে। এর মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৭ হাজার কিলোমিটার। গত অর্থবছরে মন্ত্রণালয়টির আওতায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার খননকাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান তিনি।

মন্ত্রী বলেন, খালপাড়ে বৃক্ষরোপণ, খালে মাছ ও হাঁস পালন এবং কুটিরশিল্পের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে পুনঃখনন করা খালগুলোকে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও কর্মসংস্থানের উৎস হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

 কেন নেওয়া হচ্ছে মডেল খাল কর্মসূচি

মন্ত্রণালয়ের ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, পুনঃখনন করা খালগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত না হলে সেগুলো আবারও অবৈধ দখল, আবর্জনা ও পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ সমস্যা মোকাবিলা এবং সরকারি জলসম্পদের স্থায়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতেই মডেল খাল কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এ কর্মসূচিতে খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও পানি ধারণক্ষমতা অক্ষুণ্ন রেখে সামাজিক বনায়ন, মাছ ও হাঁস পালন, মৌসুমি সবজি চাষ এবং নৌচলাচলের সুযোগ রাখা হবে। একই সাথে স্থানীয় মানুষের বৈধ ব্যবহার নিশ্চিত করে অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য আয় ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।

সরকারের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রার সাথেও এ উদ্যোগের সামঞ্জস্য রয়েছে। খালপাড়ে জলসহিষ্ণু ও ফলজ গাছ লাগানোর মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ, মাটির ক্ষয় রোধ এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সহায়তা ও ভাতানির্ভর সামাজিক নিরাপত্তার বাইরে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলোকে স্বাবলম্বী করে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার বিদ্যমান আইনগত ও প্রশাসনিক এখতিয়ার বজায় রেখেই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।

 আট বিভাগে ২০টি খাল নির্বাচন

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগ থেকে তিনটি করে এবং রংপুর, সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে দুটি করে খাল নির্বাচন করা হবে। প্রতিটি খালের গড় দৈর্ঘ্য তিন কিলোমিটার ধরে মোট প্রায় ৬০ কিলোমিটার খাল এ পরীক্ষামূলক কর্মসূচির আওতায় আসবে।

ইতোমধ্যে পুনঃখনন করা হয়েছে—এমন কোনো খাল স্বয়ংক্রিয়ভাবে মডেল খাল হিসেবে নির্বাচিত হবে না। বিভিন্ন জেলার প্রস্তাব যাচাই করে জিপিএস স্থানাঙ্ক, জমির খতিয়ান, দখল পরিস্থিতি, পানিপ্রবাহ এবং স্থানীয়ভাবে চাষাবাদের উপযোগিতা বিবেচনায় চূড়ান্ত ২০টি খাল নির্ধারণ করা হবে।

উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্থানীয় অতিদরিদ্র কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতাভুক্ত পরিবার, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছেন—এমন দরিদ্র পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে উপকারভোগীদের নির্বাচন করা হবে।

খালে থাকবে পৃথক ব্যবহার অঞ্চল

মডেল খালের পানি নিষ্কাশন ও পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে এলাকাভিত্তিক পৃথক অঞ্চল নির্ধারণ করা হবে। খালের নির্দিষ্ট অংশ স্থানীয় মানুষের গোসল, গৃহস্থালি কাজে পানি সংগ্রহ এবং গবাদিপশুর ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে।

খালের গভীর ও উপযোগী অংশে সংশ্লিষ্ট মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরামর্শে নিয়ন্ত্রিতভাবে মাছ ও হাঁস পালনের ব্যবস্থা করা হবে। যেখানে নৌযান চলাচলের সুযোগ রয়েছে, সেখানে নৌচলাচলের জন্য নির্দিষ্ট পথ রাখা হবে। পাশাপাশি খালের দুই পাড়ে জলসহিষ্ণু ও ফলজ গাছ লাগানো এবং ঢালু অংশে মাচা পদ্ধতিতে মৌসুমি সবজি চাষের সুযোগ তৈরি করা হবে।

 ২,৪০০ পরিবারকে নিয়ে গঠন হবে সমবায়

প্রস্তাবিত কর্মসূচিতে প্রায় ২ হাজার ৪০০ অতিদরিদ্র পরিবারকে যুক্ত করে স্থানীয় পর্যায়ে সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে। সমবায়ে অন্তত ৫০ শতাংশ নারী সদস্যের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে কোনো ব্যক্তি বা সমবায়কে খাল, খালপাড়ের জমি কিংবা সরকারি অবকাঠামোর ওপর স্থায়ী মালিকানা দেয়া হবে না। নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী, শুধু অ-হস্তান্তরযোগ্য ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে।

মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, খালপাড়ের দরিদ্র পরিবারগুলো এসব সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হলে খালের সুরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণে নিজেরাই আগ্রহী হবে। এতে খাল পুনর্দখল ও ভরাটের ঝুঁকি কমার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হতে পারে।

১০ কোটি টাকার ঘূর্ণায়মান তহবিল

মন্ত্রণালয়ের ধারণাপত্র অনুযায়ী, আলাদা কোনো বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ না করে বিদ্যমান সরকারি কাঠামোর মধ্যেই কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন এবং উপজেলা প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করবে।

প্রাথমিক বিনিয়োগের জন্য সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। এ অর্থ স্থায়ী অনুদান বা দীর্ঘমেয়াদি ভর্তুকি হিসেবে নয়, বরং ঘূর্ণায়মান তহবিল হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। উৎপাদন ও আয় শুরু হলে সমবায়গুলো নিজেদের উপার্জন থেকে পরিচালন ব্যয় বহন করবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে সরকারি অর্থের ওপর নির্ভরতা কমবে বলে আশা করছে মন্ত্রণালয়।

কর্মসূচির তদারকিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তমন্ত্রণালয় স্টিয়ারিং কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ১২ মাস কর্মসূচি পরিচালনার পর স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়নের ভিত্তিতে এটি দেশব্যাপী সম্প্রসারণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সেখ ফরিদ আহমেদ বাসসকে বলেন, মডেল খাল কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো স্থানীয় নিবন্ধিত হতদরিদ্র পরিবারগুলোকে সংগঠিত করে সমবায় গঠন করা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির প্রথম দুই বছর সরকার প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা, উৎপাদন উপকরণ, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহযোগিতা দেবে। পরীক্ষামূলক পর্যায় শেষে খালভিত্তিক উৎপাদন ও আয় থেকে স্থানীয় সমবায়গুলোর স্বনির্ভরতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

মন্তব্য করুন