Logo
×

Follow Us

জাতীয়

নতুন আইনে অঙ্গ প্রতিস্থাপনে বাড়ল সুযোগ

কমবে বিদেশমুখীতা, সাশ্রয় হবে চিকিৎসা ব্যয়

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম

নতুন আইনে অঙ্গ প্রতিস্থাপনে বাড়ল সুযোগ

এ আই দিয়ে তৈরি। ছবিঃ বাসস

‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-২০২৬’ পাসের ফলে দেশে কিডনি ও লিভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ প্রতিস্থাপনে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। নিকটাত্মীয়ের পাশাপাশি ‘ইমোশনাল ডোনার’ বা নিঃস্বার্থবাদী দাতার অঙ্গদানের আইনি স্বীকৃতি পাওয়ায় রোগীদের বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার প্রবণতা কমার পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যয়ও সাশ্রয় হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও আইনজীবীরা।

নতুন আইন অনুযায়ী, সরকারের অনুমোদনপ্রাপ্ত নির্দিষ্ট হাসপাতালেই মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন করা যাবে। সুস্থ ও স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি নিজের জীবনযাত্রায় গুরুতর ঝুঁকি তৈরি না হলে নিকটাত্মীয়কে অঙ্গ দান করতে পারবেন। একই শর্তে নিঃস্বার্থবাদী দাতাও নিকটাত্মীয় নন—এমন কোনো ব্যক্তিকে অঙ্গ দিতে পারবেন। তবে চক্ষু, চর্ম, টিস্যু ও অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে দাতাকে নিকটাত্মীয় বা নিঃস্বার্থবাদী হওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।

নিঃস্বার্থবাদী দাতা নির্ধারণ ও অনুমতি প্রদান কমিটির সভাপতি এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, নতুন আইন দেশে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে। আইনি সুরক্ষা থাকায় কিডনি ও লিভার প্রতিস্থাপনের মতো চিকিৎসা দেশে আরো বিস্তৃত করার পথ তৈরি হয়েছে।

তিনি জানান, আইন কার্যকর হওয়ার পর বিএমইউতে নিঃস্বার্থবাদী দাতার কাছ থেকে পাওয়া কিডনি প্রতিস্থাপনও হয়েছে। গত ১০ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো এ ধরনের কিডনি প্রতিস্থাপন সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

দেশে লিভার প্রতিস্থাপনের ব্যয় তুলনামূলক কম হওয়ায় বিদেশমুখিতা কমানো সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি। অধ্যাপক হাওলাদার জানান, সরকারি অনুদানের অর্থে বিএমইউতে ছয়টি লিভার প্রতিস্থাপন বিনামূল্যে করা হয়েছে। একটি লিভার প্রতিস্থাপনে প্রায় ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। বিদেশে চিকিৎসা নিলে এর সঙ্গে বিমান ভাড়া, আবাসনসহ অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হয়। দেশে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে রোগীদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমবে।

ব্রেইন ডেথ ঘোষণায় নির্দিষ্ট নিয়ম

নতুন আইনে ব্রেইন ডেথ ঘোষণার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে ব্রেইন ডেথ ঘোষণা করতে হলে নির্ধারিত শর্তে অন্তত ১২ ঘণ্টা সুস্পষ্ট কারণে অবিরাম কোমায় থাকতে হবে। ২ থেকে ১৩ বছর বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রোএনসেফালোগ্রাম বা ইইজি পরীক্ষার মাধ্যমে অন্তত ১২ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের বিধান রাখা হয়েছে।

মেডিসিন, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন, নিউরোলজি ও অ্যানেসথেশিওলজি বিষয়ের অন্তত তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি ব্রেইন ডেথ ঘোষণা করতে পারবে। তবে এই কমিটির কোনো চিকিৎসক বা তাঁর নিকটাত্মীয় অঙ্গ প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত থাকতে পারবেন না।

 কখন অঙ্গ সংগ্রহ করা যাবে

জীবদ্দশায় কেউ স্বেচ্ছায় অঙ্গদানের সম্মতি দিয়ে গেলে কিংবা ব্রেইন ডেথের পর তার আইনানুগ উত্তরাধিকারী লিখিত অনুমতি দিলে প্রতিস্থাপনের জন্য অঙ্গ সংগ্রহ করা যাবে। ব্রেইন ডেথ ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোনো দাবিদার না থাকলেও নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতির ভিত্তিতে অঙ্গ সংগ্রহের সুযোগ রাখা হয়েছে।

আইনে অঙ্গদাতা ও গ্রহীতার বয়স এবং শারীরিক যোগ্যতার বিষয়েও নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্রেইন ডেথ ব্যক্তির ক্ষেত্রে অঙ্গদাতার বয়স ২ থেকে ৭০ বছর এবং জীবিত দাতার ক্ষেত্রে ১৮ থেকে ৬৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ প্রয়োজনে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে বয়সসীমা শিথিল করা যেতে পারে।

অঙ্গ গ্রহীতার বয়সসীমা ২ থেকে ৭০ বছর রাখা হয়েছে। তবে ১৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী ব্যক্তিরা অঙ্গ গ্রহীতা হিসেবে অগ্রাধিকার পাবেন। কর্ণিয়া, চর্ম ও টিস্যু প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে এই অগ্রাধিকার প্রযোজ্য হবে না।

নিঃস্বার্থবাদী দাতার শর্ত

আইন অনুযায়ী, নিঃস্বার্থবাদী দাতার বয়স ১৮ বছরের বেশি হতে হবে। তাকে মানসিকভাবে সুস্থ এবং নিজের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। কোনো আর্থিক প্রলোভন বা চাপ ছাড়া স্বেচ্ছায় অঙ্গদানে আগ্রহী ব্যক্তি এ ধরনের দাতা হতে পারবেন। গ্রহীতার নিকটাত্মীয় না হলেও দীর্ঘদিনের পরিচিত ব্যক্তি নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে নিঃস্বার্থবাদী দাতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন।

তবে এ ক্ষেত্রে নিঃস্বার্থবাদী দাতা নির্ধারণ ও অনুমতি প্রদান কমিটির সুপারিশ প্রয়োজন হবে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি, আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে অঙ্গ দিতে আগ্রহী ব্যক্তি কিংবা অঙ্গদানের জন্য শারীরিকভাবে অনুপযুক্ত কোনো ব্যক্তি নিঃস্বার্থবাদী দাতা হতে পারবেন না।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, আগের আইনি কাঠামোয় নিকটাত্মীয়ের বাইরে অঙ্গদানের সুযোগ সীমিত ছিল। এ সীমাবদ্ধতা নিয়ে করা রিটের শুনানি শেষে হাইকোর্ট যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে ‘ইমোশনাল ডোনার’-এর কাছ থেকে কিডনিসহ অঙ্গ গ্রহণের সুযোগ দেয়ার বিষয়ে রায় দেন এবং আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিতে নির্দেশনা দেন।

তার মতে, সেই রায়ের ধারাবাহিকতায় নতুন আইন দেশে অঙ্গদানের পরিসর বাড়িয়েছে। আগে দাতা না পাওয়ায় অনেক রোগী বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিদেশে গিয়ে কিডনি বা অন্যান্য অঙ্গ প্রতিস্থাপন করতেন। নতুন আইনের সঠিক প্রয়োগ হলে দেশে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি রোগীদের বিদেশমুখিতা ও চিকিৎসা ব্যয় দুটিই কমতে পারে।

 অঙ্গ কেনাবেচা নিষিদ্ধ

নতুন আইনে মানবদেহের কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেনাবেচা, অঙ্গের বিনিময়ে আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধা গ্রহণ এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিজ্ঞাপন বা প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী, কেউ নিকটাত্মীয়তার বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দিলে কিংবা অন্য কাউকে এমন তথ্য দিতে উৎসাহিত, প্ররোচিত বা ভয় দেখালে সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

এ ছাড়া আইনের অন্য কোনো বিধান লঙ্ঘন বা লঙ্ঘনে সহায়তা করলে সর্বোচ্চ তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কোনো চিকিৎসক এ আইনের অধীনে দণ্ডিত হলে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের দেয়া তার নিবন্ধন বাতিল হতে পারে।

কোনো হাসপাতালে আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে ওই হাসপাতালের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজনের অনুমতি বাতিল করা যাবে। একই সাথে জরিমানা এবং প্রয়োজনে হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিত করারও বিধান রাখা হয়েছে।

মন্তব্য করুন