Logo
×

Follow Us

জাতীয়

বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের ২০ উদ্যোগের ৭টি বাস্তবায়ন

পাইপলাইনে ১৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম

বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের ২০ উদ্যোগের ৭টি বাস্তবায়ন

বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের ২০ উদ্যোগের ৭টি বাস্তবায়ন

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের নেওয়া ২০টি উদ্যোগের মধ্যে সাতটি ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসেছে। এসব উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ ও খাত থেকে সম্ভাব্য ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইন তৈরি করেছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। এর মধ্যে ৪০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।

চলতি বছরের ১৬ মার্চ বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, ব্যবসায়িক সেবা সহজ করা এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ২০টি উদ্যোগ ঘোষণা করে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। উদ্যোগগুলো তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে ভাগ করা হয়েছে—শক্তিশালী অবকাঠামো, বিনিয়োগে সহায়তা এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন।

বাস্তবায়িত উদ্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম চট্টগ্রাম বন্দরের ৫৫ কোটি ডলারের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল। এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছে। এপিএম টার্মিনালস ২০৩০ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। টার্মিনালটি চালু হলে ৭০০-এর বেশি প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা প্রায় ৪৪ শতাংশ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে এগিয়েছে। চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। শিল্পাঞ্চলটিতে এক লাখের বেশি প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকল্পটির বিনিয়োগ পাইপলাইন প্রায় ১৩০ কোটি ডলার, যার মধ্যে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ইতোমধ্যে সক্রিয় রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগও বাস্তবায়ন হয়েছে। এখন কাস্টমস ছাড়পত্র ও ব্যাংকিং সেবা সার্বক্ষণিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে। এতে পণ্য খালাসের সময় কমার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের বিলম্বজনিত ভোগান্তি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিনিয়োগকারীদের সেবা এক জায়গায় আনতে বিডা, বেজা ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষের বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সমন্বয় করে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগ সহায়তা, জমি, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও পিপিপি প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য ও সেবা এক প্ল্যাটফর্মে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) সম্পন্ন হওয়াকেও বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা পাবে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৪২৮টি পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা থাকবে।

বিনিয়োগকারীদের সমস্যা দ্রুত সমাধানে প্রধানমন্ত্রী ও ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের মধ্যে সংলাপের ব্যবস্থাও চালু হয়েছে। প্রথম দুই দফা সংলাপে উত্থাপিত ২৮টি সমস্যার মধ্যে ২১টির বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৭৫ শতাংশ সমস্যার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে এফডিআই প্রণোদনা কর্মসূচিও অনুমোদন করা হয়েছে। এর আওতায় দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সক্ষম যোগ্য ব্যক্তিকে আনা বিনিয়োগের ইক্যুইটির ১ দশমিক ২৫ শতাংশ সমপরিমাণ প্রণোদনা দেয়ার কথা রয়েছে। এ কর্মসূচির নির্দেশিকা অনুমোদনের পর এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ চলছে। আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে এটি চালুর লক্ষ্য রয়েছে।

এদিকে ২০ উদ্যোগের বাকি ১৩টিও বিভিন্ন পর্যায়ে এগোচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল, মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, প্রথম সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল, বাংলাবিজ বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ, চীনের গুয়াংজুতে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয় স্থাপন এবং দেশব্যাপী শিল্প খাতের ম্যাপিং।

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পিপিপি কাঠামোয় পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। এতে ইউএইভিত্তিক বন্দর ও লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড যুক্ত থাকবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ উদ্যোগে বন্দর ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক পরিচালন দক্ষতা যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালও ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ চালুর লক্ষ্য রয়েছে। এটি চালু হলে বিমানবন্দরের বার্ষিক কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ২ লাখ টন থেকে বেড়ে ৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। এতে সক্ষমতা ১৫০ শতাংশ বাড়ার পাশাপাশি ৬ হাজারের বেশি প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।

নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে ইনভেস্ট বাংলাদেশ প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের একটি বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগ পাইপলাইন তৈরি করেছে। এর মধ্যে ৪০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত বা বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। সম্ভাব্য বিনিয়োগের মধ্যে চীন থেকে ৬০ কোটি, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৩০ কোটি, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০ কোটি এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১০ কোটি ডলার আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

খাতভিত্তিক হিসাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রায় ৩০ কোটি ডলার করে বিনিয়োগের সম্ভাবনা চিহ্নিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা ও বস্ত্র খাতেও প্রায় ২০ কোটি ডলার করে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।

বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে তৈরি করা হয়েছে এফডিআই হিটম্যাপ। এতে উন্নতমানের বস্ত্র, ওষুধশিল্প, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে রাখা হয়েছে। অটোমোটিভ যন্ত্রাংশ, হালকা প্রকৌশল, জুতা ও চামড়াজাত পণ্যকে দ্রুত বিনিয়োগ প্রবেশের উপযোগী খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের দ্রুত সেবা দিতে বাংলাবিজের আওতায় তিন দিনের ‘বিজনেস স্টার্টার প্যাকেজ’ চালুর কাজ চলছে। পাশাপাশি ১৪ দিনের ‘বিজনেস রেডিনেস প্যাকেজ’ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনিয়োগের শুরু থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও সেবা পাওয়ার সময় কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।

এ ছাড়া পাঁচটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অধীনে ১০ হাজার একরের বেশি শিল্প জমিতে ৪৪টি বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে একটি পোর্টফোলিও তৈরির কাজ চলছে। চীনে বিনিয়োগ প্রচার বাড়াতে গুয়াংজুতে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

ইনভেস্ট বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, অবকাঠামোগত ঘাটতি, বিচ্ছিন্ন সেবা, অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত প্রকল্পের স্বল্পতার মতো সমস্যাগুলো দূর করতেই এসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আরো প্রতিযোগিতামূলক ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ তৈরির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

মন্তব্য করুন