প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩১ পিএম
ছবিঃ পিএমও
জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আগামী পাঁচ বছরের জন্য সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, নীতির ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
শনিবার (৩ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজনে তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সরকার এখন প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর্যায় পেরিয়ে সেগুলো বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে। বাংলাদেশকে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি উৎপাদন ও বিনিয়োগের শক্তিশালী কেন্দ্র বানানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানি খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও তুলে ধরেন তিনি। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, সবচেয়ে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের মায়ের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা, কৃষিসেবা ও বাজারব্যবস্থার সাথে যুক্ত করা হবে। হেলথ কার্ডের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ইউনিভার্সেল কার্ড চালু করে নাগরিকদের সমন্বিত সরকারি সেবা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এসব কর্মীর প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন। তারা স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্য পরামর্শ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীকে রেফার করবেন। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার কথা বলেন তিনি।
শিক্ষাব্যবস্থার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু সনদ অর্জন নয়, শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করাও। আনন্দময় শিক্ষা পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগের পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটানোর কথাও জানান তিনি।
প্রথম শ্রেণি থেকে বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, মিড-ডে মিল ও বৃত্তি দেয়ার উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, মেয়েদের জন্য স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগও সম্প্রসারণ করা হবে। তরুণ জনগোষ্ঠীকে দেশের উন্নয়নের অন্যতম শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি ভাষাগত দক্ষতা, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান।
কৃষিকে অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও বাজারসংযোগ আরো সহজ করা হচ্ছে। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তার পাশাপাশি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশেও গুরুত্ব দেয়া হবে।
পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেয়া এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কথাও বলেন তিনি।
পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নির্ধারণের কথা জানিয়ে তারেক রহমান সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেন। বাংলাদেশে বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড সার্টিফায়েড কারখানার ৫৩টি রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব শহর গড়ে তোলার মাধ্যমে বর্জ্য কমানো এবং জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি জোরদারের পাশাপাশি মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখার কথা জানান তিনি। আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। তাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক সমর্থন ও অর্থায়নের পাশাপাশি সংকটের মূল কারণ সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের যোগাযোগ আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি। জাহাজ চলাচল, মৎস্য, পর্যটন, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং তরুণদের জন্য আরও সুযোগ তৈরির মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে অভিন্ন সমৃদ্ধির পথ তৈরি করা সম্ভব।
বাংলাদেশ সংলাপ, অংশীদারত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধায় বিশ্বাসী উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করবে বাংলাদেশ। শান্তি ও সম্প্রীতিকে যৌথ সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
সিজিএস আয়োজিত এবারের বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে শতাধিক দেশের প্রায় ২০০ বক্তা, ৩০০-এর বেশি প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দিচ্ছেন। সম্মেলনে সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ, মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ, মালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসা মারাসহ বিভিন্ন দেশের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, গবেষক, ব্যবসায়ী, প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নিচ্ছেন।
৩ থেকে ৫ অক্টোবরের এই সম্মেলনের আলোচনায় ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবারস্পেস ও তথ্যক্ষমতা, বাণিজ্য ও সংযোগ, কৌশলগত প্রবৃদ্ধি, জলবায়ু, সহনশীলতা এবং মানব নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থান পেয়েছে।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)