বাংলাদেশকে বৈশ্বিক বিনিয়োগের কেন্দ্রে নিতে চায় সরকার: প্রধানমন্ত্রী
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৬ এএম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বাংলাদেশকে উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানিমুখী বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে নীতির ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। একই সাথে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশ খাতে একাধিক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।
শনিবার (৩ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সংলাপ ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর উদ্বোধনী আয়োজনে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, নবনির্বাচিত সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনায় জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতির ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এখন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করার দিকে এগোতে চায় সরকার।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি উৎপাদন ও রপ্তানি খাত সম্প্রসারণের ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানি খাতে কর্মসংস্থান বাড়ানোর মাধ্যমেও দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় নতুন পরিকল্পনা
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। পরিবারের মায়েদের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দিতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা ও কৃষিসেবার আওতায় আনতে কৃষক কার্ড এবং চিকিৎসাসেবা সহজ করতে হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি। ভবিষ্যতে ইউনিভার্সেল কার্ডের মাধ্যমে নাগরিকদের সমন্বিত সরকারি সেবা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হবে বলেও জানান।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা বলেন তারেক রহমান। এসব কর্মীর প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন। তাঁরা স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীদের উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষাকেও এ উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব
শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের উপযোগী করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের ওপরও গুরুত্ব দেন তারেক রহমান। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণি থেকেই শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে স্কুলের পোশাক, ব্যাগ, দুপুরের খাবার ও বৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের কথাও জানান তিনি।
তরুণদের দেশের উন্নয়নের বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে ভাষাগত দক্ষতা, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগে সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
কৃষি, পানি ও পরিবেশ সুরক্ষায় লক্ষ্য
কৃষিকে অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, কৃষকদের জন্য প্রযুক্তি, সেচ, অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থা আরো সহজলভ্য করার পরিকল্পনা রয়েছে। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তার পাশাপাশি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশেও গুরুত্ব দেয়া হবে।
পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি।
পরিবেশ রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নির্ধারণের কথাও জানান তারেক রহমান। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব কারখানা স্থাপনের ওপর জোর দেন তিনি।
গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও মানবাধিকার
প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখতে হবে। আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো প্রধান লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক সমর্থন ও অর্থায়ন প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বঙ্গোপসাগর ঘিরে আঞ্চলিক সহযোগিতার আহ্বান
বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির বিকাশের মাধ্যমে বৈশ্বিক যোগাযোগ আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। জাহাজ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায়ও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা।
বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে সম্মিলিত সমৃদ্ধিতে রূপ দিতে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন বাজার তৈরি এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশ সংলাপ, অংশীদারত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধায় বিশ্বাসী উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত রেখেই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সাথে ইতিবাচকভাবে কাজ করবে সরকার। শান্তি ও সম্প্রীতিকে যৌথ সমৃদ্ধি এবং উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিন দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে শতাধিক দেশের অংশগ্রহণ বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, শতাধিক দেশ থেকে প্রায় ২০০ জন বক্তা, ৩০০-এর বেশি প্রতিনিধি এবং এক হাজারেরও বেশি অংশগ্রহণকারী এতে যোগ দিচ্ছেন। সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, গবেষক, সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞরাও সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।
অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছেন সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ, মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ এবং মালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসা মারা।
এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘Fragments, Frontiers and Futures: Navigating Power, Technology and Trust in a World Rewritten’। ৩ থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এ আয়োজনে ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও যোগাযোগ, জলবায়ু পরিবর্তন, মানব নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও সুশাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে। বৈশ্বিক ক্ষমতার পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত সম্ভাবনাও আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)