Logo
×

Follow Us

জাতীয়

ভূমিকম্প মোকাবিলায় ৪১ পয়েন্টে সরঞ্জাম, প্রস্তুত ১০০ ফায়ার স্টেশন

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম

ভূমিকম্প মোকাবিলায় ৪১ পয়েন্টে সরঞ্জাম, প্রস্তুত ১০০ ফায়ার স্টেশন

ছবিঃ বাসস

বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা ও জরুরি সেবা সচল রাখতে প্রস্তুতি জোরদার করছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। সম্ভাব্য দুর্যোগে সদর দপ্তর বা কোনো ফায়ার স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যাতে উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত না হয়, সে জন্য জনবল, সরঞ্জাম ও কমান্ড ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ করা হচ্ছে। এর আওতায় ঢাকা ও আশপাশের ৪১টি স্থানে উদ্ধার সরঞ্জাম ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি পূর্বাচলে বিশেষ উদ্ধার দল মোতায়েন এবং ঢাকার বাইরে ১০০টি ফায়ার স্টেশনকে জরুরি সহায়তার জন্য প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসসকে জানান, বড় ভূমিকম্প হলে একই সময়ে একাধিক এলাকায় উদ্ধার অভিযান চালানোর প্রয়োজন হতে পারে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জনবল, উদ্ধার সরঞ্জাম ও নেতৃত্বের কাঠামো বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

ভূমিকম্পের সময় নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দেয়ার প্রযুক্তি এখনো না থাকায় আগাম প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংস্থাটি। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এ ধরনের দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগে থেকেই করণীয় সম্পর্কে ধারণা রাখা এবং নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে প্রস্তুতি যাচাই করা জরুরি।

 বিকেন্দ্রীকরণে সচল থাকবে কমান্ড ব্যবস্থা

ভূমিকম্পে পুরান ঢাকায় অবস্থিত ফায়ার সার্ভিসের পুরোনো সদর দপ্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যেন উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশনা দেয়া যায়, সে জন্য বিকল্প ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে দুজন পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কমান্ড কর্মকর্তাদের মিরপুরে অফিস করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সদর দপ্তরের মিডিয়া উইংয়ের প্রধান কার্যক্রমের একটি অংশও সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে।

এ ছাড়া মিরপুর-১০-এর ট্রেনিং কমপ্লেক্সের কার্যক্রম পূর্বাচলের নতুন মাল্টিপারপাস ট্রেনিং কমপ্লেক্সে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, দুর্যোগের কারণে কোনো একটি স্থাপনা অকার্যকর হয়ে পড়লেও সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম চালু রাখা।

 মিরপুরে নির্মাণ হচ্ছে ভূমিকম্পসহনশীল সদর দপ্তর

পুরান ঢাকার সদর দপ্তরের ঝুঁকি বিবেচনায় মিরপুর-১০ এলাকায় ভূমিকম্পসহনশীল বহুতল সদর দপ্তর ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকার সহযোগিতায় নির্মাণাধীন ভবনটিতে প্রথমবারের মতো ‘বেজ আইসোলেশন’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তিটি ভূমিকম্পের কম্পন ভবনে সরাসরি ছড়িয়ে পড়ার প্রভাব কমাতে সহায়তা করবে। ভবনটি আট মাত্রার ভূমিকম্পেও ভেঙে পড়বে না বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা। গণপূর্ত অধিদপ্তরের সহযোগিতায় ২০২৮ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। পরে ফায়ার সার্ভিসের পুরো অধিদপ্তর সেখানে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

 ৪১ স্থানে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে উদ্ধার সরঞ্জাম

ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার সরঞ্জামের বড় অংশ আগে সদর দপ্তরে সংরক্ষিত থাকত। ভূমিকম্পে সদর দপ্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলে এসব সরঞ্জাম আটকে গিয়ে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ঝুঁকি কমাতে ঢাকা ও আশপাশের ৪১টি পয়েন্টে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ভাগ করে রাখা হয়েছে।

এ ব্যবস্থায় কোনো ফায়ার স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা সেখানকার সরঞ্জাম ব্যবহার করা না গেলে কাছাকাছি অন্য স্টেশন থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে অভিযান চালানো সম্ভব হবে। এর ফলে একটি স্থাপনার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।

 পূর্বাচল ও বিভাগীয় শহরে বিশেষ উদ্ধার দল

বড় ভূমিকম্পে একসাথে অনেক ভবন ধসে পড়লে নিয়মিত ফায়ার স্টেশনের জনবল দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হতে পারে। এ বিবেচনায় স্পেশাল রেসকিউ টিম (এসআরটি) গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস।

পূর্বাচলে ৫০ থেকে ৬০ সদস্যের একটি বিশেষ উদ্ধার দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দুর্যোগের পর প্রয়োজন অনুযায়ী দলটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করবে। একইভাবে বিভিন্ন স্টেশন থেকে সদস্য নিয়ে প্রতিটি বিভাগীয় সদর দপ্তরে ২০ জনের একটি করে বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে।

এসব দলকে ধসে পড়া ভবনের ভেতরে আটকে পড়া মানুষ খোঁজা ও উদ্ধারের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য, দুর্যোগের পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আটকে পড়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং পরিকল্পিতভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা।

 ঢাকাকে সহায়তা দেবে ১০০ ফায়ার স্টেশন

বড় ভূমিকম্পে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে ঢাকার বাইরে ১০০টি ফায়ার স্টেশনকে জরুরি সহায়তার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মহানগরের কোনো স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা বিদ্যমান জনবল দিয়ে উদ্ধারকাজ চালানো সম্ভব না হলে এসব স্টেশন থেকে কর্মী ও সরঞ্জাম এনে সহায়তা দেয়া হবে।

দুর্যোগের কারণে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলে হেলিকপ্টারে উদ্ধার সরঞ্জাম ও বিশেষ দল স্থানান্তরের বিষয়েও বিমান বাহিনীর সাথে আলোচনা হয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

 উদ্ধার সরঞ্জাম সরবরাহে আলোচনা

ভূমিকম্প ও বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহের বিষয়েও উদ্যোগ চলছে। এ নিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সাথে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকের একাধিক বৈঠক হয়েছে। বৈঠকগুলোতে উদ্ধার অভিযানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জামের চাহিদা তুলে ধরা হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিছু সিদ্ধান্তও নিয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

 বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থায় মহড়া

বড় ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ডে মোবাইল টাওয়ার, ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক ও অন্যান্য যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে উদ্ধারকারী দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখার সক্ষমতা যাচাইয়ে গত আগস্টে অ্যামেচার রেডিও অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আরাব) সহায়তায় দেশব্যাপী কমিউনিকেশন এক্সারসাইজ পরিচালনা করা হয়।

মহড়ায় বেতার, মোবাইল ও ল্যান্ডফোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পরিস্থিতি তৈরি করে বিভিন্ন ফায়ার স্টেশনের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখার অনুশীলন করা হয়। বড় দুর্যোগের সময় প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়লেও যাতে সমন্বয় অব্যাহত রাখা যায়, সেটিই ছিল এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।

 সমন্বিত প্রস্তুতির ওপর বিশেষজ্ঞদের গুরুত্বারোপ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বাসসকে বলেন, বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে। ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর ও ময়মনসিংহসহ বিশেষ করে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এ ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত প্রস্তুতি প্রয়োজন।

তার মতে, বড় ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ছোট-বড় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, নিয়মিত মহড়া এবং সরঞ্জামের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। উন্নত দেশগুলোর জন্যও বড় ভূমিকম্প সামাল দেয়া কঠিন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যমান সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেয়া জরুরি।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান বাসসকে বলেন, বড় ভূমিকম্পের পর একই সময়ে একাধিক স্থানে সৃষ্ট বিপর্যয় মোকাবিলাই হবে সংস্থাটির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ভবনধস, মানুষের আটকে পড়া, গ্যাসলাইনে আগুন এবং বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা উদ্ধারকাজকে আরো জটিল করে তুলতে পারে।

তিনি আরো বলেন, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে সরু রাস্তা, যানজট, অবৈধ পার্কিং ও ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধারকারী যানবাহনের ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। আবার ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের স্থিতিশীলতা যাচাই না করে ভেতরে প্রবেশ করলে উদ্ধারকারীরাও ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন, আটকে পড়া ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ, অগ্রাধিকার অনুযায়ী উদ্ধার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করাকে গুরুত্ব দেয়া হবে। একই সাথে উদ্ধারকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।

মন্তব্য করুন