সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৭ এএম
ছবিঃ বাসস
জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দল, মত, ধর্ম ও বর্ণের পার্থক্য ছাড়াই দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের লক্ষ্য।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ৮১তম সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিতেই উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে হবে।
দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা কাজে লাগিয়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং বাংলাদেশকে একটি ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি স্টার্টআপ খাতে চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের কথাও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, অর্থনৈতিক গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এর লক্ষ্য হলো প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুফল দেশের প্রতিটি পরিবারে পৌঁছে দেয়া। জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী হওয়ায় নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নারী উদ্যোক্তাদের নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনাবেতনে শিক্ষার সুযোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের সহায়তায় ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ড চালুর কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবারের নারী প্রধানের নামে দেওয়া ফ্যামিলি কার্ড নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক। এসব কর্মসূচিকে সমন্বিত করে ভবিষ্যতে একটি ইউনিভার্সাল কার্ড চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকারের অগ্রাধিকারের খাত হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, দেশের ইতিহাসে এবার শিক্ষায় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্যের কথাও জানান তিনি। কর্মমুখী শিক্ষা বিস্তারে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ব্যাগ, স্কুল ইউনিফর্ম ও বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেয়ার উদ্যোগের কথা বলেন।
খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের অংশ হিসেবে শিক্ষা সিলেবাসে স্পোর্টসকে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত জুনে দেশজুড়ে মাসব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। একই সাথে শহর ও গ্রামের বৈষম্য কমিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির সঙ্গে জাতিসংঘের ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’ নীতির অধিকাংশ কার্যক্রমের সামঞ্জস্য রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।
প্রযুক্তির বৈষম্য নিয়েও সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। তার ভাষায়, বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করলেও প্রযুক্তির সুবিধা সবার জন্য সমান নয়। বর্তমান ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক সহায়তার পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত ও মানবিক সংকটের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বিরোধের সমাধান হতে হবে আলোচনা, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে। সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং সম্মান-মর্যাদাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি করার আহ্বান জানান তিনি। পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকারের প্রতিও সমর্থন জানান।
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের ওপরও জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এতে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বড় চাপ তৈরি হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে উল্লেখ করে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনকেই এর সমাধান হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী আসন্ন কপ-৩১-এ জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় আরও কার্যকর বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, পরিচ্ছন্ন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বন্যা-খরা মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনার কথা বলেন তিনি। তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ এবং আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার কথাও তুলে ধরেন।
নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা মানবতার সেবায় কাজ করছেন। শান্তিরক্ষা মিশনে নারীদের অংশগ্রহণ ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ কর্মসূচির প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন বলেও উল্লেখ করেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য ‘রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: অ্যা ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভারস ফর অল’ উল্লেখ করে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
সবশেষে তরুণদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ, নারীদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে চলা এবং প্রতিটি শিশুর সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করে একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য তুলে ধরেন তারেক রহমান। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বকে স্বাগত জানিয়ে তিনি গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল—‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)