সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন এই স্কিমের আইনি ভিত্তি তৈরিতে খসড়া আইন প্রণয়ন করে জাতীয় সংসদে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের (এনপিএ) পরিচালনা পর্ষদ স্কিমটি চালুর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান জানিয়েছেন, শরিয়াহভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর আওতায় শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ, তহবিল পরিচালনা, মুনাফা নির্ধারণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি জানান, স্কিমটির পরিচালনপদ্ধতি, বিনিয়োগ ব্যবস্থা ও অন্যান্য কারিগরি বিষয় চূড়ান্ত করতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও স্থানীয় পরামর্শকেরা কাজ করছেন। পাশাপাশি নতুন স্কিমের আর্থিক স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি দায় নির্ধারণে অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণও করা হবে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ বৈঠকে শরিয়াহভিত্তিক সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালুর প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সভায় পেনশন ব্যবস্থার সুযোগ বাড়ানো, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং নতুন অংশগ্রহণকারী যুক্ত করার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়।
প্রস্তাবিত শরিয়াহভিত্তিক স্কিমে পেনশন তহবিল শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগনীতির আওতায় পরিচালিত হবে। তহবিলের অর্থ কোন খাতে বিনিয়োগ করা হবে, পরিচালন ব্যয় কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং বিনিয়োগের ঝুঁকি কীভাবে সামলানো হবে—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। আইনগত ও কারিগরি প্রক্রিয়া শেষ হলে স্কিমটি চালুর পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করা হবে।
এদিকে বিদ্যমান সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার সুবিধাও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কোনো পেনশনার মারা গেলে তার স্বামী বা স্ত্রী কিংবা নির্ধারিত সুবিধাভোগীকে পেনশন দেয়ার বয়সসীমা ৭৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮০ বছর করা হয়েছে। তবে পেনশনার নিজে জীবদ্দশায় আজীবন পেনশন সুবিধা পাবেন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সর্বজনীন পেনশন তহবিলের বিনিয়োগের বিপরীতে গ্রাহকদের মুনাফার হারও বাড়ানো হয়েছে। আগের ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশের পরিবর্তে এ অর্থবছরের জন্য মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ।
সর্বজনীন পেনশনের আওতা বাড়াতে সরকারি মালিকানাধীন যেসব প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির কর্মীরা প্রচলিত সরকারি পেনশন সুবিধার আওতায় নেই, তাদের ‘প্রগতি’ স্কিমে যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠানকে কী প্রক্রিয়ায় এই ব্যবস্থায় আনা হবে, তা পরবর্তী সময়ে নির্ধারণ করা হবে।
বিদেশগামী কর্মীদেরও পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের ‘প্রবাস’ স্কিম সম্পর্কে জানানো এবং দেশে থাকতেই তাদের নিবন্ধনের সুযোগ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে বিদেশে যাওয়ার আগেই কর্মীরা সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারবেন।
বর্তমানে সর্বজনীন পেনশনে পেনশন পাওয়ার নির্ধারিত বয়স ৬০ বছর। এই বয়সসীমা কমিয়ে ৫৫ বছর করার প্রস্তাব নিয়ে পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে আলোচনা হলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা রয়েছে।
পেনশন তহবিল থেকে অংশগ্রহণকারীদের ঋণ দেয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। তহবিলের অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঋণ দেয়ার ফলে পেনশনভোগীদের স্বার্থ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
সর্বজনীন পেনশনের সঙ্গে স্বাস্থ্যবিমা যুক্ত করার বিষয়েও কাজ চলছে। সম্ভাব্য স্বাস্থ্যবিমা মডেল এবং এর ফলে পেনশন তহবিলের ওপর আর্থিক প্রভাব কী হতে পারে, তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে পেনশনের মুনাফা দেয়ার বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব উদ্যোগের কোনোটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেনি।
অন্যদিকে নতুন গ্রাহক বাড়াতে নিবন্ধন কার্যক্রমে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রণোদনা বাড়ানো হয়েছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে পেনশন গ্রাহক নিবন্ধন করা হচ্ছে। আগে একজন নতুন গ্রাহক নিবন্ধনের জন্য ১৫ টাকা প্রণোদনা দেয়া হলেও তা বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতেও নতুন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সরকারি নিরীক্ষার পাশাপাশি একটি বেসরকারি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম দিয়ে আর্থিক কার্যক্রম নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে পেনশন তহবিলের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে অতিরিক্ত নিরীক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত হবে।
দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করা হয়। বর্তমানে ‘প্রগতি’, ‘সুরক্ষা’, ‘সমতা’ ও ‘প্রবাস’—এই চারটি স্কিম চালু রয়েছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর শুরু পর্যন্ত চারটি স্কিমে মোট নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার। তাদের জমার পরিমাণ প্রায় ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ‘সমতা’ স্কিমে নিবন্ধিত হয়েছেন ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন এবং তাদের জমার পরিমাণ ৫৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ‘প্রবাস’ স্কিমে নিবন্ধিত হয়েছেন ১ হাজার ১৭১ জন। এ স্কিমে জমা হয়েছে ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
সর্বজনীন পেনশনে প্রত্যাশিত হারে অংশগ্রহণ না বাড়ায় নতুন স্কিম ও সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শরিয়াহভিত্তিক পেনশন চালু, উত্তরাধিকারীর পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ মুনাফা নির্ধারণ, সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অন্তর্ভুক্তি এবং নিবন্ধন প্রণোদনা বাড়ানোর মাধ্যমে কর্মসূচির পরিধি সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে।
তবে শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালুর আগে আইনি কাঠামো চূড়ান্ত করা, জাতীয় সংসদের প্রক্রিয়া সম্পন্ন, বিনিয়োগনীতি নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় অ্যাকচুয়ারিয়াল ও কারিগরি বিশ্লেষণ শেষ করতে হবে। এসব ধাপ শেষ হওয়ার পরই নতুন স্কিম বাস্তবায়নের পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারিত হবে।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)