Logo
×

Follow Us

জাতীয়

বিচারিক শৃঙ্খলায় হাইকোর্টে রিট নিষ্পত্তি বেড়েছে, কমবে মামলার চাপ

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১০ এএম

বিচারিক শৃঙ্খলায় হাইকোর্টে রিট নিষ্পত্তি বেড়েছে, কমবে মামলার চাপ

হাইকোর্ট

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে চলতি বছরে নতুন রিট মামলার তুলনায় নিষ্পত্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিচারিক শৃঙ্খলা আরো কার্যকর করা গেলে এবং ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয় রিটের মাধ্যমে হাইকোর্টে না আনলে মামলার চাপ আরও কমবে বলে মনে করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।

রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর আদালতে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। বিচারিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত হলে রিট মামলার সংখ্যাও কমে আসবে এবং এর মাধ্যমে মানুষ কার্যকরভাবে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ পাবে।

সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলামের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬০টি। বছরের প্রথম তিন মাসে, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত নতুন রিট দায়ের হয় ৪ হাজার ১১২টি। একই সময়ে নিষ্পত্তি করা হয় ২ হাজার ২১৩টি মামলা।

এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রান্তিকে নতুন রিট মামলা হয় ৪ হাজার ৭২৯টি। বিপরীতে এই সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ৯ হাজার ৫৯০টি রিট। অর্থাৎ তিন মাসে নতুন মামলার তুলনায় নিষ্পত্তির সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। জুনের শেষে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৯টিতে।

হাইকোর্টে বিপুলসংখ্যক রিট মামলা বিচারাধীন থাকার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, অনেক সময় জনস্বার্থের মামলার নামে ব্যক্তিস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রিট করা হয়। তার মতে, কিছু ক্ষেত্রে রিট দায়েরের পর তা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রচারের প্রবণতাও দেখা যায়, যা অনাকাঙ্ক্ষিত।

তিনি আরও বলেন, সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় হাইকোর্টের জন্য বাধ্যতামূলক। কোন ধরনের মামলা হাইকোর্ট গ্রহণ করতে পারবেন, সে বিষয়ে আপিল বিভাগের একাধিক রায় রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, বেসরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট গ্রহণযোগ্য নয়—এমন সিদ্ধান্ত থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সময়ে কিছু হাইকোর্ট বেঞ্চ এ ধরনের রিট গ্রহণ করে আদেশ দিয়েছেন। তার মতে, এ ধরনের বিচারিক অসংগতি দূর করা গেলে রিট মামলার সংখ্যা কমবে।

ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয়েও সরাসরি হাইকোর্টে রিট করার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অ্যাটর্নি জেনারেল। জমি দখল, জমির সীমানা কিংবা বিল-বাঁওড় সংক্রান্ত বিরোধের মতো বিষয়ে সাধারণত নিম্ন আদালতে গিয়ে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অনেকে সেই প্রক্রিয়া এড়িয়ে সরাসরি হাইকোর্টে রিট করছেন। এতে রিট মামলার সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করেন তিনি।

সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে পাঁচ ধরনের রিটের সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে **হেবিয়াস করপাস** বেআইনিভাবে আটক ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করার ক্ষেত্রে, **ম্যান্ডামাস** আইন অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব পালনে নির্দেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে এবং **সার্টিওরারি** আইনবহির্ভূত বিচারিক আদেশ বাতিলের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনাল আইনগত ক্ষমতার বাইরে কার্যক্রম চালালে তা বন্ধে **প্রহিবিশন** এবং কোনো ব্যক্তি আইনগত যোগ্যতা ছাড়া সরকারি পদে থাকলে তার বৈধতা যাচাইয়ে **কো-ওয়ারেন্টো** রিট করা যায়।

‘মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ’ মামলার রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে জনস্বার্থে রিটের আইনগত ভিত্তি আরও সুস্পষ্ট হয়। ওই রায়ে বলা হয়, জনস্বার্থের পরিপন্থী কোনো ঘটনায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জনস্বার্থে আইনি প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট করতে পারে।

দেশে গত কয়েক দশকে জনস্বার্থে করা রিট মামলার মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এসেছে। হাইকোর্টের রায় ও আদেশের মাধ্যমে নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, নদী দখলমুক্ত করা, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ এবং পাহাড় কাটা প্রতিরোধের মতো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য, নিরাপদ খাদ্য, দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ এবং নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায়ও রিট মামলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

অনেক ক্ষেত্রে একজনের দায়ের করা জনস্বার্থের রিটের রায় বা আদেশের সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠী পেয়ে থাকে। ফলে ব্যক্তিস্বার্থের মামলা ও প্রকৃত জনস্বার্থের রিটের মধ্যে পার্থক্য বজায় রেখে বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য করুন