Logo
×

Follow Us

জাতীয়

অনুমোদনের আগেই ৮০% কাজ শেষ, এখন অনুমোদনে তোড়জোড়

প্রকল্প উঠছে একনেকে

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৯ এএম

অনুমোদনের আগেই ৮০% কাজ শেষ, এখন অনুমোদনে তোড়জোড়

সংগৃহীত ছবি

একনেকের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়ার আগেই পোশাক ও চামড়া খাতের শ্রমিক সুরক্ষা প্রকল্পের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। অথচ ৮৯ কোটি ২৫ লাখ টাকার প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। এমনকি প্রকল্পের অর্থায়নকারী জার্মান সংস্থা জিআইজেডের সাথে করা অনুদান চুক্তির নির্ধারিত মেয়াদও এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। এ অবস্থায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেওয়া ‘দ্য ইমপ্রুভড ওয়ার্কিং কন্ডিশন অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ফর ওয়ার্কার্স ইন দ্য টেক্সটাইল অ্যান্ড লেদার সেক্টর’ শীর্ষক প্রকল্পটির বাস্তবায়ন করছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)। প্রকল্পের নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। অর্থাৎ মেয়াদ শেষ হতে এখন প্রায় সাড়ে তিন মাস বাকি।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের তৃতীয় এবং বর্তমান সরকারের অষ্টম একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। জিআইজেডের ৭ মিলিয়ন ইউরো অনুদানে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। তবে একনেকের অনুমোদনের আগেই এর বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে।

ডিআইএফইর সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রকল্পের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন স্টাডি, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরি এবং প্রায় সাড়ে ৮ লাখ শ্রমিকের তথ্য নিয়ে ডাটাবেজ তৈরির কাজ রয়েছে। এসব কার্যক্রমে অনুদানদাতা সংস্থার সহায়তা নেয়া হয়েছে।

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের বিধান অনুযায়ী, একনেক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর প্রকল্পের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম শুরু করার কথা। কিন্তু এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। এমনকি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) বৈদেশিক অর্থায়ন সুবিধার কথা উল্লেখ করে প্রকল্পটি অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় রাখা হয়।

প্রকল্পের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (এসপিইসি) সভায় প্রকল্পের টিএপিপির বিভিন্ন ত্রুটি ও পর্যবেক্ষণ সংশোধনের নির্দেশ দেয়া হয়। সাধারণত এ ধরনের নির্দেশনার পর দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সংশোধিত টিএপিপি জমা দেয়ার কথা থাকলেও তা জমা দিতে শ্রম মন্ত্রণালয় ও ডিআইএফইর প্রায় ১৪ মাস সময় লাগে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংশোধিত টিএপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়।

এর আগেই অবশ্য জিআইজেডের সাথে করা অনুদান চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ২০২৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সরকার ও জিআইজেডের মধ্যে ৭ মিলিয়ন ইউরো অনুদানের সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। চুক্তির মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।

চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে চলতি বছরের ৯ মার্চ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগ। সেখানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং হালনাগাদ তথ্য সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক জবাব দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে অনুদান চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।

ডিআইএফইর অর্থ ও পরিকল্পনা অধিশাখার যুগ্ম মহাপরিদর্শক মো. হাসিবুজ্জামান বলেন, বৈদেশিক অনুদানভিত্তিক কারিগরি প্রকল্পে আগে টিএপিপি অনুমোদনের ক্ষেত্রে এতটা কঠোরতা ছিল না। উন্নয়ন সহযোগীরা অনেক সময় নিজেদের প্রক্রিয়ায় কাজ শুরু করত। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশন এ বিষয়ে কড়াকড়ি করায় অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তার দাবি, টিএপিপি পুনর্গঠনে বিলম্বের পেছনে জিআইজেডের নিজস্ব প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও একাধিকবার প্রস্তাব সংশোধনের বিষয়টি বড় কারণ।

তিনি আরও জানান, ইআরডির অনুমোদন নিয়ে প্রকল্পের কিছু কার্যক্রম আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। দুর্ঘটনায় নিহত বা আহত শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তা, কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপন ও পুনর্বাসনের মতো কার্যক্রমের জন্য পাইলট ইআইএস কর্মসূচিও চলছে।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখার উপসচিব মো. আমজাদ হোসেন বলেন, এসপিইসি সভার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী অর্থনৈতিক সংশোধনী তৈরি করতে সময় লেগেছে। দাপ্তরিক নথি সংশোধন ও টিএপিপি পুনর্গঠনেও কিছুটা বেশি সময় প্রয়োজন হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের কিছু কার্যক্রম চলছে এবং এর মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ শ্রমিকের তথ্য সংবলিত ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া ৯২টি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড-বায়ার স্কিমটিতে অর্থায়ন করছে এবং বেকার শ্রমিকদের তিন মাস পর্যন্ত মাসিক ১৫ হাজার টাকা সহায়তার একটি প্রটোকল তৈরি হয়েছে।

তবে প্রকল্পের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। ৮৯ কোটি ২৫ লাখ টাকার মোট বরাদ্দের বড় অংশ পরামর্শক ফি, সফটওয়্যার, বিদেশ ভ্রমণ এবং সভা-সেমিনারের জন্য রাখা হয়েছে। তাদের মতে, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, দুর্ঘটনা বীমা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলেও ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ পরামর্শক ও সভা-সেমিনারে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, এটি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার ২০২৬-এর শ্রম ও শ্রমিক কল্যাণসংক্রান্ত অঙ্গীকার এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) ৮ দশমিক ৮ লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে অনুমোদনের আগে কাজ শুরু এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে প্রকল্পটির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন আল রশীদ বলেন, একনেকের অনুমোদনের আগে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু করার বিধান নেই। অনুদাননির্ভর প্রকল্পের ক্ষেত্রেও অনুমোদন ছাড়া কাজ করার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, অনুমোদনের আগে কাজ শুরু হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রকল্পের কাজ বাস্তবে সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা যাচাই না করে অনুমোদন দেয়া উচিত নয়।

মন্তব্য করুন