জুলাই সনদের সব বিষয় বাস্তবায়ন হবে: চিফ হুইপ
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম
ছবি: বাসস
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো স্বাক্ষর করেছে, সেগুলোর প্রতিটি বিষয় বাস্তবায়ন করা হবে। প্রয়োজন হলে বিদ্যমান সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এর আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথা একাধিকবার বলেছেন চিফ হুইপ।
সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষে জাতীয় সংসদ ভবনে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে চিফ হুইপ বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার। সনদে স্বাক্ষরিত বিষয়গুলো বাস্তবায়নে সংবিধানে পরিবর্তন প্রয়োজন হলে সেই প্রক্রিয়ায় এগোতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার বিরোধী দলের সাথেও একযোগে কাজ করতে চায় বলে জানান তিনি।
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সব পক্ষকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের সংবিধান বিভিন্ন সময়ে সংশোধনের নজির রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নেও একই সাংবিধানিক পথ অনুসরণ করা হবে।
তৃতীয় অধিবেশনের কার্যক্রম তুলে ধরে চিফ হুইপ জানান, ২৭ আগস্ট শুরু হয়ে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট নয়টি কর্মদিবস অধিবেশন চলে। এ সময়ে ছয়টি বিল উত্থাপনের পাশাপাশি ছয়টি বিল পাস হয়েছে। সংসদের বিভিন্ন কার্যপ্রণালির বিধিতে নোটিশ ও আলোচনা হয়েছে। বিধি ৬৮-এর আওতায় দুটি নোটিশ, বিধি ৭১-এর আওতায় ১৪টি বিষয় এবং দুই মিনিটের বক্তব্যের বিধিতে ১২৪টি নোটিশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার জন্য ১৪৪টি প্রশ্নের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নিজে ১৫টির উত্তর দিয়েছেন। এছাড়া মন্ত্রিসভার সদস্যরা মোট ২ হাজার ৬৭৬টি প্রশ্নের মধ্যে ১ হাজার ৬৭৮টির উত্তর দিয়েছেন।
চিফ হুইপের ভাষ্য অনুযায়ী, তৃতীয় অধিবেশনে পাস হওয়া গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলোর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর এবং সম্পত্তিতে আজীবন ভোগদখলের অধিকারসংক্রান্ত আইন উল্লেখযোগ্য। তার মতে, এই আইনের মাধ্যমে সন্তানদের কাছে সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও বাবা-মায়ের জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকারসংক্রান্ত আইন নিয়েও কথা বলেন নূরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেন, এসব আইন প্রণয়নের আগে রাষ্ট্রদূত, বিভিন্ন অংশীজন, আইনজীবী, বিচারক ও সাংবাদিকদের মতামত নেয়া হয়েছে। মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই আইনগুলো শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস পরিস্থিতি নিয়ে চিফ হুইপ বলেন, আন্দোলন বা লংমার্চের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে সাধারণত দুই থেকে তিন বছর সময় প্রয়োজন হয়। তাই সমস্যা সমাধানে সরকারকে সময় দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আগের সরকারের সময় বিদ্যুৎ খাতে বিভিন্ন চুক্তি ও ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও করেন চিফ হুইপ। এসব চুক্তি ও বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় বর্তমান সরকার পর্যালোচনা করছে বলে জানান তিনি।
সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর গত পাঁচ মাসে আগের সরকারের রেখে যাওয়া প্রায় ২০৫ কোটি ডলারের ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুরুত্ব দিচ্ছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
কৃষি খাতের প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, কৃষকদের সহায়তার জন্য কৃষিঋণ ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। দেশে বর্তমানে প্রায় ১৬ লাখ মেট্রিক টন সার অতিরিক্ত মজুদ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। সার ব্যবস্থাপনায় কিছু ত্রুটি থাকলেও কৃষকদের কাছে সার পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি।
বিদেশি দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের ১০১টি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ সরকার পর্যালোচনা করছে বলেও জানান চিফ হুইপ। এসব চুক্তির আর্থিক দিকসহ বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানান তিনি। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন দেশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের বিষয়েও তথ্য দেন চিফ হুইপ। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির মধ্যে ২২টিতে বিরোধী দলের তিনজন করে সদস্য এবং অন্য কমিটিগুলোতে দুজন করে সদস্য রাখা হয়েছে। সরকারি অর্থ ব্যয়ের ওপর নজরদারি করা পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির সভাপতির দায়িত্ব বিরোধী দলের সদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সরকার ও বিরোধী দলের সংসদীয় সম্পর্ক প্রসঙ্গে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়েনি; বরং সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে বিরোধী দলের লংমার্চের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লংমার্চের মাধ্যমে যদি বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হতো, তাহলে সরকারই আগে এমন কর্মসূচি নিত।
সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠভাবে সংবাদ পরিবেশনের আহ্বান জানিয়ে চিফ হুইপ বলেন, সরকারের ভুল থাকলে তা তুলে ধরতে হবে এবং ভালো কাজ হলেও সেটি জনগণের সামনে আনতে হবে। সরকারের কর্মকাণ্ডে কোনো ঘাটতি থাকলে সাংবাদিকরা তা তুলে ধরবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
চিফ হুইপ বলেন, সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও এককভাবে আইন পাস না করে বিরোধী দলসহ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে চায়। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে জানান তিনি।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)