দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে তিন মাসব্যাপী বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচিসহ একগুচ্ছ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সম্ভাব্য সংক্রমণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের সব জেলার সিভিল সার্জনকে হাসপাতালের প্রস্তুতি জোরদার এবং সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সরকারের আশঙ্কা, চলতি সেপ্টেম্বরের শেষ অথবা অক্টোবরের শুরুতে দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী ১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিন মাসব্যাপী বিশেষ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।
চলতি বছরের মার্চ থেকেই ডেঙ্গু প্রতিরোধে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে আসছে সরকার। এর অংশ হিসেবে প্রতি শনিবার বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে এডিস মশার লার্ভা শনাক্তে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালানো হচ্ছে।
ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার চালু করা হয়েছে। রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাঠে একটি ফিল্ড হাসপাতালও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া সারা দেশে প্রায় ৩০০ চিকিৎসককে ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসায় বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করার নির্দেশনা রয়েছে। একই সাথে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে তাদের মোট শয্যার ১০ শতাংশে বিনামূল্যে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রোগ নির্ণয় কেন্দ্রগুলোকে ডেঙ্গু ও সংশ্লিষ্ট পরীক্ষায় ৮০ শতাংশ ছাড় দিতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির সহযোগিতায় ডেঙ্গু চিকিৎসার সমন্বিত গাইডলাইনও হালনাগাদ করা হয়েছে।
তিন মাসের বিশেষ কর্মসূচিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি স্কাউট, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), গার্ল গাইডস, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবক এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা কার্যক্রমকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডেঙ্গুতে প্রতিদিন মৃত্যুর পাশাপাশি হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত দেশের সব সিভিল সার্জনের সঙ্গে জুম বৈঠক করে হাসপাতালের প্রস্তুতি জোরদারের নির্দেশ দেন। বৈঠকে ডেঙ্গু রোগীদের হাসপাতালে ভর্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত শয্যার সংখ্যা বাড়ানোর নির্দেশনা দেয়া হয়।
সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ডেঙ্গু রোগীদের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী ওয়ার্ডের রোগীদের জন্যও মশারির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে স্যালাইন, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিটের ঘাটতি দেখা দিলে হাসপাতালের নিজস্ব তহবিল থেকে দ্রুত এসব সামগ্রী কেনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দেশের সব সিভিল সার্জনের সঙ্গে বৈঠক করে ডেঙ্গু রোগীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভর্তি এবং হাসপাতালের সক্ষমতা অনুযায়ী শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তার মতে, এর মাধ্যমে রোগীর চাপ বাড়লেও শয্যা সংকট এড়ানো সম্ভব হবে।
তিনি জানান, বর্তমানে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও স্যালাইন পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত রয়েছে। কোথাও ঘাটতি দেখা দিলে হাসপাতালের নিজস্ব বাজেট থেকে দ্রুত প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে।
ঢাকার সিভিল সার্জন ডা. জাকারিয়া মাহমুদ জানান, ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ইতোমধ্যে স্যালাইন ও ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট সরবরাহ করা হয়েছে। এসব উপকরণের কোনো সংকট নেই। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সম্ভাব্য মহামারি পরিস্থিতি ঠেকাতে এখন থেকেই বাসাবাড়ি ও কর্মস্থল পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি দেশজুড়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানান, মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে এবং স্কুল হেলথ কর্মসূচির আওতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে সমন্বিতভাবে কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য সিভিল সার্জনদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ২৩ জুন ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে জাতীয় কমিটির প্রথম সভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এ টাস্কফোর্সের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
টাস্কফোর্সের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়া, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করা এবং মাঠপর্যায়ের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে জাতীয় কমিটিকে জানানো। বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা সমাধানেও ভূমিকা রাখবে টাস্কফোর্স।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৪৫ হাজার ৪৭৫ জন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১৩০ জনের।
এদিকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নিতে রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা (সিডিসি), রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), এমআইএস এবং হাসপাতাল শাখার পরিচালকদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)