২০৩১ সালের মধ্যে ৪৫ লাখ মানুষকে দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষরতার আওতায় আনার পরিকল্পনা
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম
ছবিঃ বাসস
২০৩১ সালের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত দেশের প্রায় ৪৫ লাখ নিরক্ষর মানুষকে জীবনমুখী শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষরতার আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে কর্মক্ষম এই জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার পাশাপাশি তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুযোগ কাজে লাগানো, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন এবং দেশের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’কে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো (বিএনএফই) এ উদ্যোগ নিয়েছে।
অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। সরকারের পরিকল্পনায় সাধারণ অক্ষরজ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি অবশিষ্ট নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে প্রায়োগিক সাক্ষরতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে কর্মমুখী করে তোলাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, শিক্ষাকে কর্মসংস্থান ও বাস্তব জীবনদক্ষতার সাথে যুক্ত করাই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার আলোকে শুধু পড়তে ও লিখতে শেখানোর মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী প্রায় ৪৫ লাখ কর্মক্ষম মানুষকে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে ২০৩১ সালের মধ্যে দেশে সাক্ষরতার হার ৯০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
‘আলফা’ কর্মসূচিতে গুরুত্ব পাবে দক্ষতা
বয়স্ক ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষার আওতায় আনতে ‘অ্যাডাল্ট অ্যান্ড ফাংশনাল লিটারেসি ফর অ্যাবিলিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম (আলফা)’ নামে একটি কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক ‘ইচ ওয়ান টিচ ওয়ান’ বা ‘প্রত্যেকে একজনকে শিক্ষা দান’ মডেলের ভিত্তিতে তৈরি কর্মসূচিটির কনসেপ্ট নোট ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনের ‘সবুজ পাতায়’ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে ৪০টি জেলার নির্বাচিত ৪০টি উপজেলায় ৩৫ হাজার নিরক্ষর মানুষকে নিয়ে এক বছর মেয়াদি একটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এই কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের ফলাফল মূল্যায়নের পর মূল প্রকল্পের মাধ্যমে ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী প্রায় ৪৫ লাখ নারী-পুরুষকে দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষরতার আওতায় আনা হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের আশা, এ উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের সাক্ষরতার হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জনের পথ আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে শতভাগ সাক্ষরতার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য পূরণের ভিত্তিও শক্তিশালী হবে।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক মনোয়ারা ইশরাত বাসসকে বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু মানুষকে পড়া ও লেখা শেখানো নয়; শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে তাদের জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা। শ্রমবাজারের বর্তমান চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে কারিগরি ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে প্রশিক্ষণ শেষে তারা দ্রুত জীবিকার সাথে যুক্ত হতে পারেন।
তিনি জানান, সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনার আওতায় নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনের ‘সবুজ পাতায়’ অন্তর্ভুক্তিসহ অনুমোদনের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। এসব প্রকল্প ও পরিকল্পনা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে ২০৩১ সালের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা করছে বিএনএফই।
বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের জন্য ‘আলো’
প্রাপ্তবয়স্কদের সাক্ষরতার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা এবং ঝরে পড়া শিশু-কিশোরদের শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘অল্টারনেটিভ লার্নিং অপারচুনিটি ফর আউট অব স্কুল চিলড্রেন (আলো)’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
১৫৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২৬ থেকে ২০২৮ মেয়াদে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্প দেশের ৬৪ জেলার নির্বাচিত ৬৪টি উপজেলায় কার্যক্রম পরিচালনা করবে। বর্তমানে প্রকল্পের বাস্তবায়ন নির্দেশিকা চূড়ান্ত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থী জরিপ শুরুর প্রস্তুতি চলছে।
প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী ১৯ হাজার ২০০ বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুকে মানসম্মত উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে অষ্টম শ্রেণি শেষ করার আগে ঝরে পড়া ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী আরও ১৯ হাজার ২০০ কিশোর-কিশোরীকে প্রাক-বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে।
বিএনএফই জানিয়েছে, সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচির আওতায় সম্প্রতি ৫৮টি জেলায় ৪ হাজার ৩১২ জন ঝরে পড়া শিক্ষার্থীকে কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর ১১টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশনস ফ্রেমওয়ার্কের (বিএনকিউএফ) আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিচালিত মূল্যায়নে তাদের মধ্যে ৪ হাজার ১৯৮ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন।
উত্তীর্ণদের মধ্যে ৩ হাজার ৮৮২ জন, অর্থাৎ ৯২ দশমিক ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থীর চাকরি, শিক্ষানবিশি অথবা স্বকর্মসংস্থানের ‘ফিউচার লিংকেজ’ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এই সফল অভিজ্ঞতাকেই ৪৫ লাখ মানুষের জন্য প্রস্তাবিত ‘আলফা’ কর্মসূচিতে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মসূচিটিতে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
‘স্কিলফো’ মডেল সম্প্রসারণের উদ্যোগ
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন, ২০১৪-এর আওতায় বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু ও নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর জন্য বয়স ও প্রয়োজনভিত্তিক শিক্ষা, জীবনদক্ষতা এবং প্রাক-বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় কক্সবাজারে বাস্তবায়িত ‘স্কিলফো’ পাইলট প্রকল্পে ৬ হাজার ৮২৫ কিশোর-কিশোরীকে মৌলিক সাক্ষরতা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের সাথে যুক্ত করার একটি কার্যকর মডেল তৈরি হয়েছে।
এই সাফল্যের ভিত্তিতে দেশের আরও ১৬টি জেলার ৬৪টি উপজেলায় ১ লাখ তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে স্কিলফোর দ্বিতীয় পর্যায় শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এ প্রকল্পের দলিল পুনর্বিন্যাসের কাজ চলছে।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর উপপরিচালক (বাস্তবায়ন) হিরামন কুমার বিশ্বাস বাসসকে বলেন, ‘আলো’, ‘স্কিলফো’ ও ‘আলফা’র মতো সমন্বিত কর্মসূচিগুলো পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপে রয়েছে। এগুলো মাঠপর্যায়ে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে ২০৩১ সালের মধ্যে নির্ধারিত সাক্ষরতার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথ আরও সুগম হবে।
আজ ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য—‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’। এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সরকারের নেওয়া দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়িত হলে ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে দক্ষতা ও শিক্ষার আওতায় এনে সাক্ষরতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)