সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ অদক্ষ চালক ও পথচারীর অসচেতনতা: সড়ক মন্ত্রী
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৩ পিএম
ছবিঃ বাসস
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে চালকদের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পথচারীদের সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সড়ক মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেছেন, অদক্ষ ও অযোগ্য চালক এবং অসচেতন পথচারী সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। একই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তায় দীর্ঘদিনের প্রকল্প, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থেকে পাওয়া জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগের ঘাটতি দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) আয়োজিত রোড সেফটি বিষয়ক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন সড়ক মন্ত্রী।
শেখ রবিউল আলম বলেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরেই সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা, সেমিনার, প্রকল্প ও পরামর্শ চলছে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা এ খাতে বিপুল অর্থায়নের পাশাপাশি কারিগরি সহায়তাও দিচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগ থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান মাঠপর্যায়ে কতটা কাজে লাগছে, তা নিয়ে আত্মসমালোচনা ও মূল্যায়ন প্রয়োজন।
সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক কর্মশালা ও সেমিনারকে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এসব আয়োজন থেকে পাওয়া সুপারিশ ও দিকনির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সাথে অতীতে নেওয়া সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পগুলোর সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা পর্যালোচনা করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তা কাজে লাগাতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, সড়ক নিরাপত্তার জন্য কী কী পদক্ষেপ প্রয়োজন, তা অনেক আগেই জানা রয়েছে। কিন্তু মূল দুর্বলতা রয়েছে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রয়োগের ঘাটতি দূর করতে না পারলে শুধু পরিকল্পনা ও প্রকল্প গ্রহণ করে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে না।
কর্মশালায় সড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। মন্ত্রী বলেন, কোন এলাকায় দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে, কী কারণে ঘটছে এবং দুর্ঘটনার ধরন কী—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো পরিকল্পনা করতে হবে। অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্তের পরিবর্তে বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ প্রকল্পের নকশা ও পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন।
শেখ রবিউল আলম বলেন, বড় মেগা প্রকল্প ও অবকাঠামো নির্মাণের সময় আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সড়ক নিরাপত্তাকে শুরু থেকেই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। দুর্ঘটনা ঘটার পর শুধু কারণ অনুসন্ধান না করে দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ প্রকল্পকে আরও নিরাপদ করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
সড়ককে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু নতুন সড়ক নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সড়কের যথাযথ সংরক্ষণ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সড়ক সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর বড় ধরনের সংস্কার প্রকল্প নেওয়ার পরিবর্তে আগেই ক্ষয়ক্ষতি শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে সরকারি সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও কমবে।
তিনি জানান, চারটি বড় সেতুতে আগাম রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের জন্য একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এ ধরনের প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। অনেক সময় সড়ক পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলে বড় সংস্কার প্রকল্প নেওয়া হয় না। আবার প্রকল্পের আকার ছোট হলে ঠিকাদারদের আগ্রহও কম থাকে। এই মানসিকতা ও প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সড়ক নিরাপত্তায় বিশেষায়িত পুলিশের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন সড়ক মন্ত্রী। তিনি বলেন, সাধারণ পুলিশ ব্যবস্থার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সড়ক নিরাপত্তার সব দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করা কঠিন। এ জন্য সড়ক নিরাপত্তা, সড়ক ব্যবস্থাপনা ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একটি দক্ষ ও বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট প্রয়োজন।
হাইওয়ে পুলিশের কাঠামো আরও দক্ষ ও বিশেষায়িত করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, কর্মকর্তাদের দীর্ঘ সময় একই ধরনের দায়িত্বে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং অর্জিত অভিজ্ঞতাকে পরবর্তী সময়ে কাজে লাগাতে হবে। ঘন ঘন দায়িত্ব পরিবর্তন হলে একজন কর্মকর্তার অর্জিত বিশেষায়িত অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়।
প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করে কোনো প্রকৌশলী অভিজ্ঞতা অর্জনের পর অন্য দপ্তরে বদলি হয়ে গেলে তার বিশেষায়িত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ কমে যায়। তাই সড়ক নিরাপত্তার জন্য বিশেষায়িত জনবল তৈরি করে তাদের দীর্ঘ সময় নির্দিষ্ট দায়িত্বে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
জেলা পর্যায়েও সড়ক নিরাপত্তায় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা রাখার কথা বলেন শেখ রবিউল আলম। তাদের দায়িত্ব হবে স্থানীয় সড়কের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জনগণকে নিরাপদ সড়ক ব্যবহারে সচেতন করা।
অদক্ষ ও অযোগ্য চালকদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক অনেক সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে চালকের বেপরোয়া ও স্বেচ্ছাচারীভাবে গাড়ি চালানোর বিষয়টি উঠে এসেছে। চালকদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও যোগ্যতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হলেও এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বাস্তবে কতটা দক্ষ চালক তৈরি হচ্ছে, তা মূল্যায়ন করা জরুরি।
তিনি বলেন, চালকের লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার পাশাপাশি যানবাহনের ফিটনেসও সমান গুরুত্ব দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে। শুধু কাগজপত্র ঠিক থাকলেই সড়ক নিরাপদ হবে না; চালক ও যানবাহন—দুটিই বাস্তবে নিরাপদ অবস্থায় থাকতে হবে।
পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন নীতিমালার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। বাস ও ট্রাকের নির্ধারিত আয়ুষ্কাল, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা এবং অযোগ্য যানবাহন শনাক্ত করার মতো বিষয়গুলো এসব নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানান তিনি।
সড়ক নিরাপত্তায় গতি নিয়ন্ত্রণ, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমানো এবং চালক ও যাত্রীদের হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন শেখ রবিউল আলম। পাশাপাশি পথচারীসহ সব ধরনের সড়ক ব্যবহারকারীকে নিরাপদে চলাচলের নিয়ম সম্পর্কে সচেতন করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাস্তায় চলাচল বন্ধ, যোগ্য চালক নিশ্চিত, গতি নিয়ন্ত্রণ, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমানো, হেলমেটের ব্যবহার নিশ্চিত এবং জনগণকে সচেতন করার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা ছাড়া সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রসঙ্গে তিনি জানান, বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তার জন্য বিশ্বব্যাংকের প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প রয়েছে। এর পাশাপাশি নতুন করে আরও দুটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যার দুটি প্যাকেজে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
শেখ রবিউল আলম বলেন, সড়ক নিরাপত্তায় বিপুল পরিমাণ সরকারি ও উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থ ব্যয় হচ্ছে। জনগণের অর্থে বাস্তবায়িত এসব প্রকল্প থেকে দৃশ্যমান সুফল নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। বিশ্বব্যাংক ও এডিবি অর্থায়নের পাশাপাশি প্রযুক্তি, পরামর্শ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দিয়ে সহযোগিতা করছে। এসব সহযোগিতা থেকে বাংলাদেশ কতটা শিখছে এবং মাঠপর্যায়ে কতটা বাস্তবায়ন করতে পারছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, নিয়মিত সেমিনার, কর্মশালা ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জিত হচ্ছে। কিন্তু সেই জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করা না গেলে এসব আয়োজন কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাওয়া সুপারিশ ও অভিজ্ঞতাকে দেশের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন তিনি।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব জিয়াউল হকের সভাপতিত্বে কর্মশালায় সড়ক পরিবহন প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান, এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)