ক্ষণিকের দেখায় প্রধানমন্ত্রীর সাথে জনগণের আত্মিক বন্ধন
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম
ছবিঃ বাসস
রোদ-বৃষ্টি কিংবা গভীর রাত—প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের পাশে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেন কয়েকজন মানুষ। অপেক্ষা করেন একজনকে একনজর দেখার জন্য। কখন তাঁর গাড়ি সেই পথ দিয়ে যাবে, তা নিশ্চিতভাবে জানা না থাকলেও প্রতিদিনের যাতায়াতের সময় ও পথের হিসাব মিলিয়ে তারা হাজির হন নির্দিষ্ট স্থানে। অপেক্ষার কেন্দ্রে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
কেউ অফিসে যাওয়ার পথে নিয়মিত দাঁড়ান, কেউ আবার প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াতের রুট জেনে নিয়েছেন। কারও অবস্থান রিকশার পাশে, কেউ দোকানের সামনে, আবার কেউ ফুটপাতে নিজের কাজের ব্যস্ততার মধ্যেই অপেক্ষা করেন কয়েক সেকেন্ডের সেই কাঙ্ক্ষিত দেখার জন্য। গাড়ির ভেতরে থাকা প্রধানমন্ত্রীকে একবার চোখে দেখাই তাদের প্রত্যাশা।
দিনের পর দিন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে এসব মানুষ এখন প্রধানমন্ত্রীর কাছেও পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। গাড়িবহর তাদের কাছে পৌঁছালে অনেক সময় গতি কিছুটা কমে আসে। রাস্তার পাশ থেকে অপেক্ষমাণ ব্যক্তিরা হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। জবাবে গাড়ির ভেতর থেকে প্রধানমন্ত্রীও হাসিমুখে হাত তুলে সাড়া দেন।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, রমনা থানার পাশে যমুনা ব্যাংকের একটি এটিএম বুথে একসময় নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন পাবনার এক বৃদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি হাতে ধানের শীষ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। গাড়ি সামনে এলে একনজর দেখে ও হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে এরপর নাশতা করে কাজে যোগ দিতেন তিনি।
তার ভাষ্য, বর্তমানে ওই এটিএম বুথটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে এবং বৃদ্ধের চাকরিও নেই। কিন্তু এখনও প্রতিদিন নিরাপত্তাকর্মীর পুরোনো ইউনিফর্ম পরে হাতে ধানের শীষ নিয়ে তিনি আগের জায়গায় এসে দাঁড়ান। কিছুক্ষণ পর প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর সেখানে পৌঁছায়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের দেখা শেষে প্রশান্তি নিয়ে নাশতা সেরে নিজের গন্তব্যে চলে যান তিনি। রুমনের মতে, এই অপেক্ষা ও ক্ষণিকের দেখার মধ্য দিয়ে পথের পাশের মানুষটির সাথে চলন্ত গাড়ির ভেতরের মানুষটির এক অকৃত্রিম সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
আতিকুর রহমান রুমন আরও জানান, বনানীর দুবাই মার্কেটের কাছে নিয়মিত দুজন রিকশাচালক প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি যাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। জীবিকার ব্যস্ততার মাঝেও তারা সেই সময়টুকুর জন্য দাঁড়িয়ে থাকেন। গাড়ি কাছে এলেই তাদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে আনন্দ ও আবেগ। কয়েক মুহূর্তের দেখাই যেন অপেক্ষার দীর্ঘ সময়কে সার্থক করে দেয়।
বনানী কাঁচাবাজার এলাকাতেও রয়েছে এমন কিছু পরিচিত মুখ। ফুল ও ফল বিক্রেতাদের কেউ কেউ প্রতিদিন অপেক্ষা করেন। ফুটপাতের হকারদের মধ্যেও রয়েছেন এমন অনেকে। কাজ থামিয়ে তারা অপেক্ষা করেন গাড়িবহরটি আসার মুহূর্তটির জন্য—শুধু একবার প্রধানমন্ত্রীকে দেখবেন বলে।
অতিরিক্ত প্রেস সচিব বলেন, কামাল আতাতুর্ক রোডে রাতের বেলায়ও একজন নিয়মিত অপেক্ষা করেন প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি ফেরার সময়ের জন্য। কখনো সেই অপেক্ষা গভীর রাত পর্যন্ত গড়ায়। নাম জানা না থাকলেও দিনের পর দিন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। গাড়িবহর সেখানে পৌঁছালে গতি কিছুটা কমে যায় এবং গাড়ির ভেতরের আলো জ্বালিয়ে হাত নেড়ে ওই ব্যক্তির শুভেচ্ছার জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী।
গুলশান-২ এলাকার প্রধান সড়ক থেকে গলির ভেতরের রেস্তোরাঁ ও হোটেলের কর্মীরাও রাতে প্রধানমন্ত্রীর ফেরার সময় অপেক্ষা করেন বলে জানান রুমন। তাদের কাছাকাছি পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী অনেক সময় গাড়ির ভেতরের বাতি জ্বালিয়ে দেন, যাতে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো তাঁকে স্পষ্ট দেখতে পারেন। আলো জ্বলে উঠতেই পরিচিত মুখগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দ।
কেউ হাত নাড়েন, কেউ আবার অপলক তাকিয়ে থাকেন। চলন্ত গাড়ি থেকে প্রধানমন্ত্রীও হাত তুলে তাদের অভিবাদনের জবাব দেন। কথা হয় না, গাড়িও থামে না; তবু সেই নীরব অভিবাদনের মধ্যেই যেন বিনিময় হয়ে যায় অনেক না-বলা অনুভূতি। কয়েক মুহূর্তের এই দেখাই দিনের পর দিন ধরে তৈরি করেছে এক ধরনের মায়ার সম্পর্ক।
আতিকুর রহমান রুমনের ভাষ্য, শুরুতে এই অপেক্ষা ছিল একতরফা। পথের ধারের মানুষগুলো জানতেন, প্রধানমন্ত্রী এই পথ দিয়ে যাবেন। তাই কাজের ফাঁকে কেউ এসে দাঁড়াতেন, কেউ অপেক্ষা করতেন শুধু একঝলক দেখার জন্য। সময়ের সঙ্গে সেই অপেক্ষা আর একপক্ষের থাকেনি। পরিচিত জায়গাগুলো কাছে এলে প্রধানমন্ত্রীও এখন অপেক্ষমাণ পরিচিত মুখগুলো খুঁজে নেন।
এই সম্পর্কের পেছনে নেই কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন, মঞ্চ বা বক্তৃতা। নেই করতালির ব্যবস্থাও। আছে শুধু অপেক্ষা, পরিচিত কিছু মুখ এবং একে অপরকে খুঁজে নেওয়ার নীরব আকর্ষণ। পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ আর চলন্ত গাড়ির ভেতরের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে কয়েক হাতের দূরত্ব থাকলেও কয়েক মুহূর্তের সেই দেখাতেই তৈরি হয়েছে এক নিঃস্বার্থ ও অকৃত্রিম বন্ধন।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)