Logo
×

Follow Us

জাতীয়

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে ২০৩০ সালে ২০০ কোটি ডলারের বাজার

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩১ এএম

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে ২০৩০ সালে ২০০ কোটি ডলারের বাজার

ছবিঃ বাসস

বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ খাতে আগামী চার বছরে বড় ধরনের বাজার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাতে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও অন্যান্য সরঞ্জামের বাজার প্রায় ১ হাজার ৯৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছে ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউএবল এনার্জি প্ল্যাটফর্ম (ডিআরইপি)। একই সময়ে ব্যাপকভাবে আবাসিক পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হলে সর্বোচ্চ ২১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব বলে সংস্থাটির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

ডিআরইপির হিসাবে, এই সক্ষমতা থেকে বছরে প্রায় ৩৪ হাজার ৫১৮ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। এতে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। পাঁচটি বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত প্ল্যাটফর্মটি মনে করছে, বাংলাদেশের আবাসিক খাতই ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের এই সম্ভাবনাকে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে নিতে পারে।

দেশে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আবাসিক খাতের বড় ভূমিকা রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ৫৭ দশমিক ২ শতাংশ, অর্থাৎ ৫১ দশমিক ৯৪ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ আবাসিক গ্রাহকেরা ব্যবহার করেছেন। দেশের ৪ কোটি ৩ লাখ পরিবারের মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৫৬ লাখ পরিবার নিজস্ব বাড়িতে বসবাস করে, যা মোট পরিবারের ৮৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

ডিআরইপির একটি সীমিত সম্প্রসারণ পরিস্থিতির হিসাবে, দেশের ১০ শতাংশ পরিবার যদি ১ থেকে ৫ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট-পিক সক্ষমতা অর্জন সম্ভব। এ ব্যবস্থা থেকে বছরে প্রায় ১৩ হাজার ৯৩৭ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারে, যা বর্তমান জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম।

কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মেহেদী বলেন, মাঝারি মাত্রায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বিস্তার ঘটানো গেলে ২১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব। এতে বছরে প্রায় ৩৪ হাজার ৫১৮ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে এবং জাতীয় চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ পূরণ করা যাবে।

তিনি বলেন, প্রতি এক মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা থেকে বছরে জাতীয় কোষাগারের প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি আমদানিনির্ভর ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার কমানো এবং প্রতি মেগাওয়াট সক্ষমতায় বছরে প্রায় ৮ হাজার ১০০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানো সম্ভব।

বর্তমানে একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে সাধারণত ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বা তারও বেশি খরচ হয়। ফলে উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ অনেক পরিবারের জন্য এখনও বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

হাসান মেহেদীর মতে, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্ভাব্য সম্প্রসারণ প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও অন্যান্য হার্ডওয়্যারসহ অন্তত ১০ ধরনের সরঞ্জামের বাজার বাড়াবে। পাশাপাশি স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা তৈরির মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে।

ডিআরইপির হিসাবে, ২০৩০ সালের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে সরঞ্জাম ও উপকরণের সম্ভাব্য বাজারমূল্য দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ হাজার ৯৭৩ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সৌর প্যানেলের বাজার প্রায় ৬২৮ মিলিয়ন ডলার এবং ইনভার্টারের বাজার প্রায় ৩৩৫ মিলিয়ন ডলার হতে পারে।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এ খাতের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ৫৪৩ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ১৩ লাখ ৭০ হাজার সবুজ কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছিল। অফ-গ্রিড সৌরবিদ্যুতের প্রতি ১ কিলোওয়াট সক্ষমতায় গড়ে ২ দশমিক ৫২টি সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। এই সক্ষমতার অর্ধেক বিবেচনা করলেও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণে প্রায় ১৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।

তবে সম্ভাবনার তুলনায় বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বর্তমান ব্যবহার এখনও সীমিত। সিপিডির গবেষণা সহযোগী মো. মেহেদী হাসান শামীম জানান, বর্তমানে নেট মিটারিংয়ের আওতায় দেশে ৪ হাজার ৫৫১টি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। এসব ব্যবস্থার সম্মিলিত সক্ষমতা ২১৩ দশমিক ৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যবস্থা ঢাকা বিভাগে স্থাপিত হয়েছে।

তিনি জানান, সরকার ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি কৌশলপত্রে ২০৩০ সালের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা ৩ হাজার মেগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে অর্থায়ন, জনসচেতনতা ও প্রশাসনিক জটিলতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্লিনের এক জরিপে দেখা গেছে, ৮৭ শতাংশ মানুষ সৌরবিদ্যুৎ সম্পর্কে জানলেও মাত্র ২১ শতাংশ এটিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মনে করেন। আবার ২৮ শতাংশ মানুষ সৌর প্যানেলের দীর্ঘস্থায়িত্ব নিয়ে সন্দিহান।

অ্যাকশনএইডের ব্যবস্থাপক আবুল আজাদ বলেন, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে বেশি প্রাথমিক খরচ, পরিবারের অনিয়মিত আয় এবং সহজ ঋণ সুবিধা সম্পর্কে সীমিত ধারণা প্রযুক্তিটির বিস্তারে বাধা দিচ্ছে। পাশাপাশি জটিল ঋণপ্রক্রিয়া, আমদানি করা উপকরণের ওপর উচ্চ অগ্রিম আয়কর এবং বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার পরিদর্শন ও জাতীয় গ্রিডে সংযোগ পেতে বিলম্বও এ খাতের বিকাশকে ধীর করছে।

এ পরিস্থিতিতে আবাসিক গ্রাহকদের নেট মিটারিংয়ের যোগ্যতার শর্ত সহজ করার সুপারিশ করেছে সিপিডি। পাশাপাশি অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করতে সব বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল আবেদন প্ল্যাটফর্ম চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সৌরবিদ্যুতের প্রসারে বিশেষ ঋণ সুবিধা, আংশিক ঋণ নিশ্চয়তা এবং ‘পে-অ্যাজ-ইউ-সেভ’ পদ্ধতির মতো অর্থায়ন ব্যবস্থা চালুর কথাও বলা হয়েছে। এতে গ্রাহকের প্রাথমিক বিনিয়োগের চাপ কমানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সিপিডি, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ) ও সোলশেয়ার সৌর প্যানেল ও লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (এলএফপি) ব্যাটারিসহ গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম শূন্য শুল্কে আমদানির সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে ছোট আকারের বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের আনুষঙ্গিক সরঞ্জামেও শুল্ক ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

এ ছাড়া অকার্যকর বা কম উৎপাদনশীল ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চিহ্নিত করে পুনর্বাসনের জন্য জাতীয় কর্মসূচি নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পুরোনো সোলার হোম সিস্টেমকে হাইব্রিড ও গ্রিড-সংযুক্ত ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে পুনরায় ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া গেলে বিদ্যমান অবকাঠামো কাজে লাগানোর পাশাপাশি গ্রাহকদের আস্থাও বাড়ানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

মন্তব্য করুন