নিরাপত্তা আধুনিকায়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২৫ প্রকল্প
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০১:৩১ পিএম
নিরাপত্তা আধুনিকায়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২৫ প্রকল্প
দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন এবং জরুরি সেবার কার্যকারিতা বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৫টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এসব প্রকল্পে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা উইং-১-এর প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কারা অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মাধ্যমে এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।
চলমান প্রকল্পগুলোর বড় একটি অংশ পুলিশের অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। দেশের বিভিন্ন স্থানে থানা ভবন কাম ব্যারাক নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ২৪০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া থানা, পুলিশ ফাঁড়ি, তদন্ত কেন্দ্র, ক্যাম্প, নৌ-পুলিশ কেন্দ্র, রেলওয়ে পুলিশ স্থাপনা, পর্যটন পুলিশ কেন্দ্র এবং হাইওয়ে পুলিশ স্টেশন নির্মাণে আরেকটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৭ হাজার ৭৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
বিশেষায়িত নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম প্রিভেনশন সেন্টার নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫৩৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। পাশাপাশি সরঞ্জাম সংগ্রহের মাধ্যমে ঢাকা মহানগর পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকল্পে ১ হাজার ১৪৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে।
সাইবার অপরাধ মোকাবিলায়ও নেওয়া হয়েছে পৃথক উদ্যোগ। ‘সেফার সাইবারস্পেস ফর ডিজিটাল বাংলাদেশ: এনহ্যান্সিং ন্যাশনাল অ্যান্ড রিজিওনাল ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশন ক্যাপাসিটি অব বাংলাদেশ পুলিশ’ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এর লক্ষ্য প্রযুক্তিনির্ভর ও সাইবার অপরাধ তদন্তে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো।
র্যাব-বিজিবি-কোস্ট গার্ডে বড় বিনিয়োগ
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের অবকাঠামো ও সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে র্যাব ফোর্সেস সদর দপ্তর নির্মাণ প্রকল্পে ৫ হাজার ৪৫৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। এর পাশাপাশি র্যাবের পরিচালন, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আরও কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে ৭৩টি কম্পোজিট ও আধুনিক বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি) নির্মাণ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ২ হাজার ৩৬৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। গাজীপুরে নবগঠিত ৬৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অবকাঠামো উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৩০ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
কোস্ট গার্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে। লজিস্টিকস ও নৌযান রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা স্থাপন এবং প্রতিস্থাপনযোগ্য নৌযান সংগ্রহের দুটি প্রকল্পে যথাক্রমে ৭ হাজার ৫৭৬ কোটি ২২ লাখ এবং ২৩ হাজার ১৪৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে।
ই-পাসপোর্ট ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব
নিরাপত্তা আধুনিকায়নের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর একটি হলো বাংলাদেশ ই-পাসপোর্ট অ্যান্ড অটোমেটেড বর্ডার কন্ট্রোল ম্যানেজমেন্ট প্রকল্প। প্রথম সংশোধিত এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৯ হাজার ৩৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটির মাধ্যমে পাসপোর্ট ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও ডিজিটাল করার পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ ও কারা ব্যবস্থায় উন্নয়ন
মাদকাসক্তদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার মোকাবিলায়ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন এবং সাত বিভাগীয় শহরে মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ রয়েছে।
সাত বিভাগীয় শহরে মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪১৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত।
কারা ব্যবস্থার আধুনিকায়নেও একাধিক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন, জামালপুর ও কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের পুনর্নির্মাণ, নরসিংদী জেলা কারাগার নির্মাণ এবং পুরান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কমপ্লেক্স সংরক্ষণ ও পার্শ্ববর্তী এলাকার উন্নয়ন এসব উদ্যোগের অন্তর্ভুক্ত।
ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়ছে
জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জন্যও বেশ কয়েকটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণ, পুরোনো স্থাপনা পুনর্নির্মাণ, অ্যাম্বুলেন্স সেবা সম্প্রসারণ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক সুবিধা বাড়ানোর কাজ চলছে।
২০টি ফায়ার স্টেশন নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৫০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১২টি নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণ এবং আটটি বিদ্যমান স্টেশন পুনর্নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া দুটি বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণে ৬৫ কোটি ১২ লাখ টাকার পৃথক প্রকল্প রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২৫টি উন্নয়ন প্রকল্পের সামগ্রিক চিত্রে দেখা যায়, দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শুধু অবকাঠামোগতভাবে শক্তিশালী করার মধ্যেই উদ্যোগ সীমাবদ্ধ নেই। সাইবার অপরাধ তদন্ত, ই-পাসপোর্ট, স্বয়ংক্রিয় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত নিরাপত্তা, সামুদ্রিক সক্ষমতা, মাদকাসক্তি নিরাময় এবং জরুরি সাড়াদান ব্যবস্থাকেও একই পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে।
কয়েকটি প্রকল্প ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যেই শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও অন্য প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ২০২৮ সাল এবং পরবর্তী সময় পর্যন্ত চলবে। সরকারের প্রত্যাশা, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি জননিরাপত্তা ও জরুরি সেবার মানও আরও উন্নত হবে।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)