Logo
×

Follow Us

জাতীয়

স্বাধীন বাংলাদেশে ‘আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না’: রাষ্ট্রপতি

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০১:৩৯ পিএম

স্বাধীন বাংলাদেশে ‘আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না’: রাষ্ট্রপতি

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না এবং গুমের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের ক্ষমতার পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনা হবে। একই সাথে গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে রাষ্ট্রকে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

রোববার (৩০ আগস্ট) বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। একটি মানুষকে গুম করার মধ্য দিয়ে শুধু একজন ব্যক্তির জীবনই বিপর্যস্ত হয় না, তাঁর পরিবারও দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা, মানসিক যন্ত্রণা ও আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়ে। তাই গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের অধিকার এবং মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে।

বিগত দেড় দশকে দেশে গুম ও গোপন বন্দিশালার মাধ্যমে ভিন্নমত দমন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ, মতপ্রকাশ কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেক মানুষকে তুলে নিয়ে গুম বা গোপনে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম ও সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ নিখোঁজ ব্যক্তিদের কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের গোপন বন্দিশালায় আটক থাকার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ফিরে এলেও অনেক মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি জানান, কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে জোরপূর্বক গুম ও গোপন হত্যার অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বলে জানান তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন সত্য উদঘাটনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে প্রকৃত বিচার নিশ্চিত করতে আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। গুমের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারকে সুরক্ষা দিতে এবং গুমের ঘটনা প্রতিরোধে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে উত্থাপনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে বলেও জানান রাষ্ট্রপতি।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকা এসব পরিবারের শুধু অপরাধীদের বিচার নয়, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের বিষয়েও সহায়তা প্রয়োজন। রাষ্ট্রকে এ দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র হতে হবে যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, তবে ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ থাকবে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

তিনি আরও বলেন, একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বিবেচনা করা যায় না। নাগরিকরা কতটা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও মানবিক পরিবেশে বসবাস করছেন এবং রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী—এসব বিষয়ও রাষ্ট্রের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

রাষ্ট্রপতি স্পষ্ট করে বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না। কোনো মা যেন সন্তানের অপেক্ষায় এবং কোনো স্ত্রী যেন স্বামীর ফিরে আসার আশায় জীবন কাটাতে বাধ্য না হন। গুমের ঘটনায় জড়িত অপরাধীরা যত প্রভাবশালীই হোক, তাঁদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাম্য, মর্যাদা, সুশাসন, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারকে রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। গুম ও বিচারহীনতার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশকে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পথে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

মন্তব্য করুন