মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, দেশজুড়ে বিশেষ অভিযান
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০২:৪০ পিএম
ফাইল ছবি
মাদকের বিস্তার ঠেকাতে সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে সারাদেশে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। পুলিশ, র্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সমন্বিতভাবে মাদকবিরোধী এ অভিযান পরিচালনা করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
দেশে মাদকসংক্রান্ত অপরাধের বিচার বর্তমানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। এ আইনে অপরাধের ধরন ও মাদকের পরিমাণভেদে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের পাশাপাশি গুরুতর কিছু অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রথম তফসিলে মাদককে ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। ‘ক’ শ্রেণিতে হেরোইন, কোকেন, ইয়াবা বা অ্যামফিটামিন, পেথিডিন, আফিম, কোকা গাছ ও প্রিকারসর কেমিক্যালসের মতো তুলনামূলকভাবে ভয়ংকর মাদক রাখা হয়েছে। ‘খ’ শ্রেণিতে রয়েছে গাঁজা, ভাং ও চরস। আর ‘গ’ শ্রেণির মধ্যে অ্যালকোহল, বিয়ার, দেশি মদ ও রেকটিফাইড স্পিরিটসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য অন্তর্ভুক্ত।
আইনের ধারা ৩৬(১)-এর সারণি অনুযায়ী, ‘ক’ শ্রেণির নির্দিষ্ট মাদকের বড় পরিমাণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। হেরোইন, কোকেন ও মরফিন জাতীয় মাদকের পরিমাণ ২৫ গ্রাম বা মিলিলিটারের বেশি হলে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বহন, পরিবহন, আমদানি-রপ্তানি, ক্রয়-বিক্রয়, সংরক্ষণ বা হস্তান্তরের মতো অপরাধে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। একইভাবে ইয়াবা বা অ্যামফিটামিনের পরিমাণ ৪০০ গ্রামের বেশি হলে একই ধরনের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে।
‘ক’ শ্রেণির মাদকের ক্ষেত্রে ৫ গ্রাম পর্যন্ত অপরাধে সর্বনিম্ন ১ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছর এবং ৫ থেকে ২৫ গ্রাম পর্যন্ত অপরাধে সর্বনিম্ন ৫ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড হতে পারে। মাদকদ্রব্যের পরিমাণ অনুযায়ী এসব শাস্তির সঙ্গে অর্থদণ্ডও প্রযোজ্য হতে পারে।
‘খ’ শ্রেণির গাঁজা, ভাং ও চরসের ক্ষেত্রে ১ কেজি পর্যন্ত মাদকের জন্য সর্বনিম্ন ১ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৩ বছর, ১ থেকে ৫ কেজির ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৩ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৭ বছর এবং ৫ কেজির বেশি হলে সর্বনিম্ন ৭ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
অন্যদিকে ‘গ’ শ্রেণির অ্যালকোহল জাতীয় মাদকের ক্ষেত্রে ৫০ কেজি বা লিটার পর্যন্ত অপরাধে সর্বোচ্চ ১ বছর, ৫০ থেকে ৫০০ কেজি বা লিটার পর্যন্ত সর্বনিম্ন ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ২ বছর এবং ৫০০ কেজি বা লিটারের বেশি হলে সর্বনিম্ন ২ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
মাদক সেবনের ক্ষেত্রেও আইনে শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ধারা ৩৬(১)-এর ক্রমিক ১৬ ও ২১ অনুযায়ী ‘ক’ ও ‘খ’ শ্রেণির মাদক সেবনের অপরাধে সর্বনিম্ন ৩ মাস থেকে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। তবে ধারা ৩৬(৪) অনুযায়ী, আদালত কারাদণ্ডের পরিবর্তে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসার জন্য মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে পাঠাতে পারেন। চিকিৎসা নিতে অনিচ্ছুক হলে তার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া নেশাগ্রস্ত অবস্থায় জনশান্তি বিঘ্নিত করা বা যানবাহন চালানোর ক্ষেত্রে ধারা ৩৬(৫) অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড হতে পারে। ধারা ৪৬ অনুযায়ী মাদকসংক্রান্ত সব অপরাধ আমলযোগ্য। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে ধারা ৪৭ অনুযায়ী জামিন পাওয়ার সুযোগও কঠোরভাবে সীমিত।
আইনে মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ধারা ৪৮ ও ৫১ অনুযায়ী গুরুতর মাদক অপরাধের বিচার দ্রুত শেষ করার বিধান রয়েছে এবং নির্ধারিত ক্ষেত্রে বিচার ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে।
মোবাইল কোর্টের মাধ্যমেও কিছু মাদক অপরাধে দ্রুত বিচার করা যায়। ধারা ৩৬(১)-এর ক্রমিক ১৬ অনুযায়ী ‘ক’ শ্রেণির মাদক সেবনের অপরাধে ৩ মাস থেকে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত সাজা হতে পারে। একইভাবে ‘খ’ শ্রেণির গাঁজা এবং অ্যালকোহলজাতীয় মাদক সেবনের ক্ষেত্রেও ৩ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারা ৩৯ অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা বিনা কারণে হয়রানিমূলক তল্লাশি বা গ্রেপ্তার করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১ বছর পর্যন্ত শাস্তির বিধান রয়েছে। ধারা ৪২(১)-এ স্বতন্ত্র শাস্তির বিধান না থাকা অপেক্ষাকৃত লঘু অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খালিদ হোসাইন রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনটি সময়োপযোগী। তিনি বলেন, আইনের ধারা ৩৬ অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ হেরোইন ও ইয়াবার ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে, যা সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে ধারা ৩৬(৪) ও ধারা ১৮-তে মাদকসেবীদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনার পাশাপাশি চিকিৎসার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।
তিনি আরও বলেন, ধারা ৫৭ অনুযায়ী মোবাইল কোর্টকে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত সাজা দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ায় মাঠ পর্যায়ে মাদকবিরোধী কার্যক্রমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন বাসসকে বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। মাদক ব্যবসা ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত এ অভিযান ও বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)