বাংলাদেশ-চীন কারিগরি শিক্ষায় সহযোগিতা নতুন অধ্যায়ের সূচনা: মাহদী আমিন
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০৮ পিএম
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন
কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান তৈরিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার হচ্ছে। এ লক্ষ্যে দুই দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে নতুন অংশীদারত্ব গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, এই সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাবে এবং তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকালে চীনের চিয়াংশি সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি নরমাল ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত ‘চীন-বাংলাদেশ শিক্ষা বিনিময় সম্মেলনে’ তিনি এসব কথা বলেন। চিয়াংশি প্রাদেশিক সরকারের আয়োজনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ‘চীন-বাংলাদেশ ভোকেশনাল এডুকেশন, ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’-এর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়।
মাহদী আমিন বলেন, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-চীন কারিগরি শিক্ষা সহযোগিতায় নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। শুধু আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে সীমাবদ্ধ না থেকে এর সুফল বাস্তবে তরুণদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই মূল লক্ষ্য। শিক্ষাকে দক্ষতা, দক্ষতাকে কর্মসংস্থান এবং কর্মসংস্থানকে নতুন সুযোগে রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশের পক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া এবং চীনের পক্ষে চিয়াংশি সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি নরমাল ইউনিভার্সিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ঝেং পেংউ সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। এর আওতায় বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, দ্বিভাষিক শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষা সম্পদ, গবেষণা, শিল্প-শিক্ষা সংযোগ এবং বাংলাদেশে শিল্প প্রশিক্ষণের সুযোগ সম্প্রসারণে দুই পক্ষ কাজ করবে।
সমঝোতার অংশ হিসেবে চীন সফর, বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রশাসকদের প্রশিক্ষণ এবং বিশেষায়িত কর্মসূচি পরিচালনার বিষয়ও রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা বাড়িয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, এই সমঝোতা শুধু একটি নথি নয়; এটি দুই দেশের মানুষের জন্য সহযোগিতাকে বাস্তব সুযোগে রূপ দেওয়ার অঙ্গীকার। তাঁর মতে, কোনো সমঝোতা তখনই সফল হয়, যখন তা প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়ন এবং বাস্তবায়ন থেকে দৃশ্যমান ফলাফলে পৌঁছায়।
সম্মেলনে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন সহযোগিতার তিনটি নতুন প্ল্যাটফর্মও উদ্বোধন করা হয়। এর মধ্যে ‘চীন-বাংলাদেশ ভোকেশনাল টিচার ট্রেনিং সেন্টার’ উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন ও ফ্যান হংহুই। চিয়াংশি সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি নরমাল ইউনিভার্সিটিতে ‘বাংলাদেশ ভোকেশনাল এডুকেশন রিসার্চ সেন্টার’ উদ্বোধন করেন মাহদী আমিন ও প্রফেসর পেই হংওয়েই। ‘বাংলাদেশ চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন সেন্টার’ উদ্বোধন করেন মো. দাউদ মিয়া ও প্রফেসর ঝেং পেংউ।
নতুন এসব সহযোগিতা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষা, শিল্পের সঙ্গে সংযোগ, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, গবেষণা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়, চীনা ভাষা শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর যোগাযোগ দুই দেশের পারস্পরিক সম্মান, সুবিধা ও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রতিফলন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কারিগরি শিক্ষায় বৃত্তি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়, পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন, শিল্প সংযোগ ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তি, রোবোটিক্স এবং স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মতো নতুন ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন মাহদী আমিন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু ডিগ্রির জন্য নয়, ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার, উদ্ভাবন ও কর্মক্ষেত্রের উপযোগী করে গড়ে তুলতে শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে কার্যকর সংযোগ প্রয়োজন।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন চীনের শিক্ষা, প্রযুক্তি, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও শিল্প খাতের অগ্রগতির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, আধুনিক ও শিল্প-সংযুক্ত বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বড় ও কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অন্যতম সম্পদ। মানসম্মত কারিগরি শিক্ষা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক দক্ষতার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে এই তরুণরা দক্ষ, উৎপাদনশীল ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাসম্পন্ন জনশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে শিল্প এবং শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। এ জন্য পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, শিক্ষক দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষায় বাংলাদেশ ও চীনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন।
সম্মেলনে চীনের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী ও শিল্প উদ্যোক্তারা অংশ নেন। চীনের পক্ষে চিয়াংশি প্রাদেশিক শিক্ষা বিভাগের উপপরিচালক ফ্যান হংহুই, আন্তর্জাতিক কার্যালয়ের পরিচালক উ জুওয়েন, চিয়াংশি সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি নরমাল ইউনিভার্সিটির পার্টি সেক্রেটারি প্রফেসর পেই হংওয়েই এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ঝেং পেংউসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলনে চীনের ১৯টি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চিয়াংশি সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি নরমাল ইউনিভার্সিটি, নানচাং ইউনিভার্সিটি, ইস্ট চায়না জিয়াওটং ইউনিভার্সিটি, চিয়াংশি ভোকেশনাল ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজ, চিউচিয়াং ভোকেশনাল ইউনিভার্সিটি, চিয়াংশি ইন্ডাস্ট্রি পলিটেকনিক কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন সমঝোতা স্মারক এবং তিনটি সহযোগিতা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা এবং শিল্প-শিক্ষা সংযোগে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী হবে। এর ফলে বাংলাদেশের তরুণদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
চীন সরকারের আমন্ত্রণে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি ও আলোচনায় অংশ নিতে তিন দিনের সরকারি সফরে চীনে রয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন এবং প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)