Logo
×

Follow Us

জাতীয়

তীব্র লোডশেডিংয়ে নাকাল সারাদেশ, ৬২ বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০২:১১ পিএম

তীব্র লোডশেডিংয়ে নাকাল সারাদেশ, ৬২ বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত

ফাইল ছবি

তীব্র জ্বালানি সংকটে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় ঢাকাসহ সারাদেশে লোডশেডিং বেড়েছে। গ্যাসের ঘাটতির পাশাপাশি কয়লা ও তরল জ্বালানি সরবরাহে সংকট, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকায় দিন-রাত বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকেরা।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে বৃহস্পতিবার ৬২টি কেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ ছিল এবং ৪২টি কেন্দ্র সীমিত সক্ষমতায় উৎপাদন করেছে। এতে দিনের সর্বোচ্চ সময়ে লোডশেডিং ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। চলতি মৌসুমে এর আগে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছিল গত ১০ আগস্ট।

বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ২৮২ মেগাওয়াট, বিপরীতে চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯৪৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন সক্ষমতার বড় একটি অংশ কাজে লাগানো যায়নি।

গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বর্তমানে সেখান থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের সরবরাহ কমিয়ে শিল্পকারখানায় তুলনামূলক বেশি গ্যাস দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এক মাসের বেশি সময় ধরে গ্যাস সংকট চলায় ঢাকার বাইরের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই লোডশেডিং চলছে। এর মধ্যে গত ১২ আগস্ট থেকে সরকারি নির্দেশনায় রাজধানীতেও লোডশেডিং শুরু হয়। ডিপিডিসি ও ডেসকো প্রতিটি এলাকায় দৈনিক এক ঘণ্টা করে লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা করলেও গ্রাহকদের অভিযোগ, বাস্তবে অনেক এলাকায় এর চেয়ে বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বহুতল ভবনে লিফট ব্যবহারে ঝুঁকি এবং বাসাবাড়িতে পানির সংকটও তৈরি হচ্ছে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও স্বাভাবিক নেই। দেশে আটটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে উৎপাদন ৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে। কারিগরি সমস্যায় পায়রা ও বড়পুকুরিয়া কেন্দ্রের উৎপাদন কমেছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে মাতারবাড়ী কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে কয়লা সরবরাহ সংকটে গত ৭ আগস্ট থেকে ভারতের আদানি গ্রুপের ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটিও উৎপাদন কমিয়েছে। কেন্দ্রটি দিনে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করলেও পিক আওয়ারে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সরবরাহ করতে পারছে।

সংকট মোকাবিলায় তুলনামূলক বেশি খরচের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হলেও ২৪টি কেন্দ্রে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের সরবরাহ ঘাটতি ছিল। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বিইপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিমের মতে, বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধ এবং পিডিবির সঙ্গে বিদ্যমান বিরোধের সমাধান করা গেলে তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি গ্যাসের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও বৃহস্পতিবার সরবরাহ ছিল ২৩৫ কোটি ঘনফুট। মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে গত জুলাইয়ে দুর্ঘটনার পর সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে। টার্মিনালটি সচল হলেও নিয়মিত এলএনজি কার্গো সময়মতো না আসায় সংকট পুরোপুরি কাটেনি।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, এলএনজি সরাসরি ক্রয়, অযোগ্য জাহাজ ব্যবহার এবং অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতার মতো বিষয়গুলো সংকট বাড়াচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার, অনিয়ম বন্ধ এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমানো কঠিন হবে।

সব মিলিয়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া এবং বন্ধ বা সীমিত উৎপাদনে থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা না গেলে লোডশেডিং পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য করুন