বড় আমদানিতে কড়াকড়ি, এলসি খোলার আগে দিতে হবে তথ্য
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৮ এএম
ফাইল ছবি
বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচার ও অবৈধ অর্থ স্থানান্তর ঠেকাতে বড় অঙ্কের আমদানি লেনদেনে নজরদারি বাড়িয়েছে সরকার। নতুন ব্যবস্থায় ৩০ লাখ মার্কিন ডলার বা তার বেশি মূল্যের কোনো আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্র (এলসি) খোলার অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় তথ্য জানাতে হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বড় অঙ্কের আমদানির ক্ষেত্রে আমদানিকারক ও বিদেশি রপ্তানিকারকের পরিচয়, পণ্যের বিবরণ, ঘোষিত মূল্য এবং সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক নথিপত্র বিস্তারিতভাবে যাচাই করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যবসার ধরন, লেনদেনের যৌক্তিকতা ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতাও পর্যালোচনা করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক।
অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নতুন আমদানিনীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের সাম্প্রতিক নির্দেশনার মাধ্যমে এ ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ৩০ লাখ ডলার বা তার বেশি মূল্যের আমদানির ক্ষেত্রে অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংককে এলসি খোলার কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা আগে অনলাইন আমদানি তদারকি ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিতে হবে। তবে সরকারি আমদানি এ বাধ্যবাধকতার আওতামুক্ত থাকবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, বড় অঙ্কের আমদানিতে অতিমূল্যায়ন, ভুয়া চালান, পণ্যের ভুল বিবরণ কিংবা বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচারের ঝুঁকি রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় আমদানি কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার আগেই লেনদেনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হবে। ঝুঁকিপূর্ণ কোনো লেনদেন শনাক্ত হলে আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও তৈরি হবে।
নির্দেশনায় বিদেশি রপ্তানিকারকের পরিচয় ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম যাচাইয়ের পাশাপাশি পণ্যের ঘোষিত মূল্য, বাণিজ্যিক চালান, শিপিং ডকুমেন্ট এবং অন্যান্য নথির মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ব্যাংকগুলোর ওপর দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকারদের মতে, আগে আমদানি লেনদেনের বিভিন্ন পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করা হলেও বড় অঙ্কের আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খোলার আগে বাংলাদেশ ব্যাংককে তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না। নতুন নিয়মের ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগাম তথ্য পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে ঝুঁকি চিহ্নিত করা সহজ হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১৩ আগস্ট বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের ১ নম্বর সার্কুলারের ৩০ নম্বর নির্দেশনায় বড় অঙ্কের আমদানি, এলসি খোলা, তথ্য সংরক্ষণ ও রিপোর্টিংয়ের বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছে। এর মাধ্যমে আমদানিসংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিধি-বিধানও একীভূত করা হয়েছে।
শুধু এলসিভিত্তিক আমদানি নয়, এলসি ছাড়া অনুমোদিত শিল্প আমদানি এবং নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে অনুমোদিত বাণিজ্যিক আমদানির তথ্যও অনলাইন ব্যবস্থায় রিপোর্ট করতে হবে। এসব লেনদেনের ধরন ও প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক নথিপত্রের তথ্যও সংরক্ষণ ও জমা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থপাচারের একটি প্রচলিত কৌশল হলো পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্য দেখিয়ে বিদেশে অর্থ পাঠানো। আবার কখনো ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে প্রকৃত আমদানিকৃত পণ্যের অসামঞ্জস্যও পাওয়া যায়। আগাম তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে এ ধরনের অনিয়ম শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়বে।
একই সাথে বড় অঙ্কের আমদানির তথ্য আগে থেকে হাতে থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর সম্ভাব্য চাপ সম্পর্কেও বাংলাদেশ ব্যাংক আগাম ধারণা পাবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, অর্থপাচার রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন হলেও বৈধ আমদানিতে যেন অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি, খাদ্যপণ্যসহ উৎপাদনসংশ্লিষ্ট জরুরি পণ্যের ক্ষেত্রে দ্রুত যাচাই শেষ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, যেকোনো অঙ্কের আমদানিতেই যথাযথ যাচাই-বাছাই থাকা প্রয়োজন। আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকের পরিচয়, পণ্যের প্রকৃত মূল্য এবং বাণিজ্যিক নথির সঠিকতা নিশ্চিত করা গেলে বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
তিনি মনে করেন, নতুন ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়ন হলে আমদানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে। পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং অর্থপাচার প্রতিরোধেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)