মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের আগ্রহ, কূটনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০৭ পিএম
ফাইল ছবি
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সামরিক জোট ‘মক্কা চুক্তিতে’ বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ায় দেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি নতুন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, এমন কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হলে শুধু ভারতের সঙ্গে নয়, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরানসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সাথেও বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের সমীকরণ জটিল হতে পারে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর সম্প্রতি মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে দেখার কথা জানান। তাঁর বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এতদিন বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখতে কোনো নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক বলয়ে সরাসরি যুক্ত না হওয়ার নীতি অনুসরণ করেছে। ফলে সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে সেই ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় বাজার যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাসী আয়, যার বড় অংশ আসে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলো থেকে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট সামরিক বা ভূরাজনৈতিক জোটে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্য ও রেমিট্যান্সের সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।
### কী এই মক্কা চুক্তি
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। চুক্তির মূল কাঠামো ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি। এতে বলা হয়েছে, কোনো সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব সদস্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে চুক্তিটি করা হয়েছে। সামরিক সক্ষমতার দিক থেকেও জোটটির গুরুত্ব রয়েছে। তুরস্কের রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী, পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্রধারী এবং সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশ।
তুরস্কের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর জন্যও এই চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। চুক্তিতে সদস্যরা নিজেদের যৌথ নিরাপত্তা জোরদার এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অঙ্গীকার করেছে।
### ভারতের সাথে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন
মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয়গুলোর একটি হলো ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক। বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত কোনো সামরিক জোটে বাংলাদেশ যুক্ত হলে নয়াদিল্লি বিষয়টি কীভাবে দেখবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন রয়েছে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়ার মতে, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো সামরিক জোটের সদস্য হলে ভারতের পাশাপাশি চীন, ইরান, জাপান, কুয়েত, ওমান, কাতার, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, সামরিক কোনো ব্লকে যুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ কোন পক্ষের অবস্থান নিয়েছে—এমন প্রশ্ন এড়িয়ে চলা কঠিন হবে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান টানাপড়েনের মধ্যেই মক্কা চুক্তি নিয়ে আলোচনা সামনে এসেছে। এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
### অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়তে পারে
বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ শাহান মনে করেন, কোনো নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক বলয়ে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত দেশের বৈশ্বিক বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাঁর মতে, বাংলাদেশ যদি মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়, ভারতসহ কয়েকটি দেশ এতে অসন্তুষ্ট হতে পারে। তবে শুধু কোনো দেশের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নয়, বরং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টি আলোচনার মধ্যে আগামী ২৭ আগস্ট জেদ্দায় অনুষ্ঠেয় ওআইসির জরুরি মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিতে যাচ্ছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর। ফলে ওই বৈঠকের আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক পদক্ষেপের বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)