ভারতে জাহাজডুবি, নিখোঁজ সাতক্ষীরার মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মামুন
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ভারতের ওডিশা উপকূলের কাছে বঙ্গোপসাগরে পানামার পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি ওশান উইনার’ ডুবে যাওয়ার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন বাংলাদেশী মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুল্লাহ আল মামুন। জাহাজে থাকা ২৪ জন ক্রুর মধ্যে দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ২২ জনের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে।
এদিকে এখনো মামুনের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে তার পরিবার। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, জাহাজডুবির পর থেকে তার সাথে আর কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এখন ভারতীয় কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর উদ্ধার অভিযানের দিকে তাকিয়ে দিন কাটছে তাদের।
ভারতীয় কোস্টগার্ড ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২২ আগস্ট বঙ্গোপসাগরে জাহাজটির সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। পরে জাহাজটি ডুবে যায়। এতে থাকা ২৪ জন ক্রুর মধ্যে ২০ জন চীনের, ৩ জন মিয়ানমারের এবং একজন বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন। জাহাজডুবির পর এখন পর্যন্ত দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ২২ জনের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে।
মামুনের বাড়ি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শহরের গণমুখী মাঠসংলগ্ন এলাকায়। সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের মধ্যে উৎকণ্ঠা। কেউ মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন, কেউ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নতুন কোনো তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
মামুনের বড় ভাই আব্দুল্লাহ আল বাকি বলেন, তার ছোট ভাইয়ের ডাকনাম মানিক। তিনি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে জাহাজে কর্মরত ছিলেন। প্রায় চার মাস সমুদ্রে দায়িত্ব পালনের পর ভারতের ওডিশা থেকে সিঙ্গাপুরগামী ‘এমভি ওশান উইনার’ জাহাজে ছিলেন তিনি।
আব্দুল্লাহ আল বাকি বলেন, গত বুধবার আমার ভাইয়ের সঙ্গে অনলাইনে সর্বশেষ কথা হয়েছে। তার স্ত্রীর সঙ্গে বৃহস্পতিবার কথা হয়েছিল। এরপর শুক্রবার জাহাজটি আকরিক নিয়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে রওনা হয়। পরে জাহাজটি দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার খবর পাই।
জাহাজটির ২৪ জন ক্রুর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশী ছিলেন মামুন। দুর্ঘটনার পর দুজনকে জীবিত উদ্ধারের খবর পেলেও তাদের কেউ বাংলাদেশী নন, এ তথ্যই পরিবারের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া দুজন চীনা নাগরিক।
মামুনের বড় ভাই বলেন, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে তারা নিয়মিত যোগাযোগ করছেন। তবে এখন পর্যন্ত মামুনের অবস্থান সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত তথ্য তারা পাননি।
তিনি বলেন, আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, ভারতীয় কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সাথে সমন্বয় করে যেন আমার ভাইয়ের বিষয়ে দ্রুত সঠিক তথ্য জানানো হয় এবং উদ্ধার অভিযান আরো জোরদার করা হয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ‘এমভি ওশান উইনার’ ওডিশার পারাদ্বীপ বন্দর থেকে লৌহ আকরিক নিয়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। জাহাজটি প্রায় ২২৫ মিটার দীর্ঘ এবং এতে প্রায় ৭২ হাজার ১০০ মেট্রিক টন লৌহ আকরিক ছিল।
২২ আগস্ট বেলা ১১টা ৪৮ মিনিটের দিকে সামুদ্রিক উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্র জাহাজটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার তথ্য পায়। এরপর কাছাকাছি থাকা বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এমটি আইসোপোস’কে উদ্ধার অভিযানে যুক্ত করা হয়। পরে ভারতীয় কোস্টগার্ডের ‘বরদ’, ‘আনমোল’ ও ‘বিজিত’ জাহাজও অভিযানে নামে।
রাতে লাইফ র্যাফট থেকে দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ভারতীয় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড যৌথভাবে আকাশ ও সমুদ্রপথে নিখোঁজদের সন্ধান চালাচ্ছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাকি ২২ জনের অবস্থান এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। জাহাজটি ঠিক কী কারণে ডুবে গেল, সে বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি।
মামুনের বাল্যবন্ধু সাদাত আল কাবিজু তার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ রাখছেন। তিনি জানান, গত এপ্রিলের শেষদিকে মামুন ‘এমভি ওশান উইনার’-এ যোগ দেন। ওডিশা উপকূল থেকে জাহাজটি ছাড়ার রাতে তার সাথে মামুনের সর্বশেষ কথা হয়। দুর্ঘটনার পর নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকেও এখন পর্যন্ত নতুন কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সাতক্ষীরার এই পরিবার এখন অপেক্ষা করছে একটি ফোনকলের জন্য, যে ফোনকলে বলা হবে, মামুন বেঁচে আছেন। বড় ভাই আব্দুল্লাহ আল বাকি বলেন, আমরা খুব ভেঙে পড়েছি। আমার মা অসুস্থ। সরকারের কাছে আমাদের একটাই অনুরোধ, আমার ভাইয়ের বিষয়ে যত দ্রুত সম্ভব একটি নিশ্চিত খবর আমাদের জানানো হোক।
বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশিতে এখনো চলছে উদ্ধার অভিযান। আর সাতক্ষীরার ছোট্ট একটি বাড়িতে স্বজনদের চোখ আটকে আছে মুঠোফোনের পর্দায়, কখন আসে সেই কাঙ্ক্ষিত খবর।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)